ভাঙ্গা ও গড়া

এখানেই শেষ নয়। যদি পূর্ববর্তী জাতির লোকেরা পরাধীন হওয়ার পরও কোন যোগ্যতা ও গুণবৈশিষ্ট্যের প্রমাণ না দেয় এবং কার্যকলাপের মাধ্যমে এ কথাই প্রমাণ করে যে, বিকৃতি করা ছাড়া তাদের দ্বারা আর কোন কাজই হবে না, তাহলে এহেন জাতিকে আল্লাহ্ নিশ্চিহ্ন করে দেন। তারপর তাদের স্থানে অন্য কোন জাতিকে আনেন। এ ব্যাপারে সব সময়ই মালিকের যে দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত, আল্লাহরও তাই হয়ে থাকে। তিনি তাঁর দুনিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে দাবীদার ও প্রার্থীদের উত্তরাধিকার অথবা জন্মগত অধিকার দেখেন না। তিনি দেখেন কার গড়ার যোগ্যতা বেশী এবং ভাঙ্গার দিকে ঝোঁক প্রবনতা কম রয়েছে। একই সময়ের প্রার্থীদের মধ্যে যারা এ দিক দিয়ে যোগ্যতর বলে প্রমাণিত হয়, তাদেরকেই দেশ পরিচালনার জন্য নির্বাচন করা হয়। যতদিন এদের ধ্বংসাত্মক কাজের চেয়ে গঠনমূলক কাজ বেশী হতে থাকে অথবা এদের তুলনায় বেশী ভাল করে গঠনমূলক কাজ করে এবং ধ্বংসাত্মক কাজও কম করে- এমন কেউ এগিয়ে না আসে- ততদিন দেশ পরিচালনার ক্ষমতা এদের হাতেই রাখা হয়।

এসব যা কিছু আমি বলছি, ইতিহাসে এর জ্বলন্ত প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ্ চিরকালই এ নীতি অনুযায়ী তাঁর দুনিয়া পরিচালনার ব্যবস্থা করছেন। দূর দেশের কথা না হয় ছেড়েই দিন। নিজেদের এ দেশের ইতিহাসটাই পর্যালোচনা করুন। এ দেশে যে সব জাতি প্রথমে বাস করতো, তাদের গঠনমূলক যোগ্যতা ও কর্ম ক্ষমতা যখন শেষ হয়ে গেল, তখন আল্লাহ্ আর্য জাতিকে এ দেশ পরিচালনার সুযোগ দিলেন। সে সময় অন্যান্য জাতি গুলোর মধ্যে যোগ্যতম ছিল আর্যজাতি। তারা এখানে এসে এক উন্নত তামাদ্দুন ও সভ্যতা গড়ে তুললো। বহু জ্ঞান ও শিল্প আবিস্কার করল। ভূগর্ভের গোপন সম্পদ উদ্ধার করে তাকে ভাল কাজে ব্যবহার করল। ধ্বংসাত্মক কাজের তুলনায় গঠনমূলক কাজই তারা বেশী করেছিল। এসব যোগ্যতা যতদিন পর্যন্ত তাদের মধ্যে ছিল ততদিন ইতিহাসের সমস্ত উত্থান-পতন সত্ত্বেও তারাই ছিল এদেশের পরিচালক। অন্যান্য জাতি ক্ষমতা দখলের জন্য বার বার এগিয়ে এসেছে কিন্তু তাদেরকে হটিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ, আর্যদের মতো যোগ্য জাতি ক্ষমতাসীন থাকা কালে অন্যকোন পরিচালকের প্রয়োজন ছিল না। আর্যরা যখন উচ্ছৃঙ্খল হয়ে বিপথে চলা শুরু করে, তখন তাদের উপর যেসব বৈদেশিক আক্রমন হয়, সেগুলোকে তাদের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে সতর্ককারী দূত স্বরূপ বলা যায়। কিন্তু তারা সতর্ক না হয়ে ধ্বংসাত্মক কাজেই লিপ্ত থাকে। গঠনমূলক কাজের তুলনায় তারা ধ্বংসাত্মক কাজ করতে থাকে অনেক বেশী। তাদের নৈতিক অধঃপতন এমন চরমে পৌঁছে যে, বামমার্গ আন্দোলনে আজো তার চিহ্ন আপনারা সুস্পষ্ট প্রত্যক্ষ করতে পারেন। মানবতাকে বিভক্ত করে তারা নিজেদেরই সমাজকে বর্ণ ও গোত্রে খণ্ডিত করল। সমাজ জীবনকে একটি সিঁড়ির মতো করে গঠন করল। এ সিঁড়ির প্রত্যেক ধাপের লোকেরা তাদের উপরের ধাপের লোকদের বান্দা বা দাস এবং নীচু ধাপের লোকদের খোদা বনে বসল। তারা আল্লাহর লাখো লাখো বান্দার উপর নির্মম যুলুম নির্যাতন চালাতে লাগল। এ যুলুম আজো অচ্ছুত শ্রেণীর আকারে বিদ্যমান রয়েছে।

তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথ সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ করে দিল। তাদের পন্ডিত ও পুরোহিতরা সাপের মত জ্ঞান ভাণ্ডারের চারদিক বেষ্টন করে বসে রইল। তাদের উপরের তলার কর্তারা দেশের জনসাধারণের উপর নিজেদের বহু অন্যায় অধিকার চাপিয়ে দিল। এ অধিকার আদায় করা এবং আরাম কেদারায় বসে বসে অন্যের পরিশ্রমের উপর নির্ভর করে বিলাসী জীবন যাপন করা ছাড়া তাদের আর কোন কাজ রইলো না। এহেন পরিস্থিতিতে আল্লাহ্ তাদের কাছ থেকে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে মধ্য এশিয়ার কতিপয় জাতিকে এখানে পরিচালনার সুযোগ দিলেন। এ জাতিগুলো সে সময় ইসলামী আন্দালনের সংস্পর্শে এসে জীবন যুদ্ধের উন্নততর যোগ্যতা অর্জন করেছিল।

 

কয়েক’শ বছর তারা এদেশ পরিচালনার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিল। এ দেশেরও বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে তাদের সাথে মিশে গিয়েছিল। অবশ্যি তারাও অনেক কিছু ধ্বংস করেছে। কিন্তু যে পরিমাণ ধ্বংস করেছে, তার চেয়ে বেশী সৃষ্টি করেছে। কয়েক’শ বছর পর্যন্ত ভারতবর্ষে যত গঠনমূলক কাজ হয়েছে তা সবই তাদের দ্বারা অথবা তাদের প্রভাবে সম্পাদিত হয়েছে। তারা দেশে জ্ঞানের আলো বিতরন করেছে। চিন্তা ও ভাবধারা পরিশুদ্ধ করেছে। সমাজ, তামাদ্দুন ও সভ্যতার অনেক কিছু সংশোধন করেছে, দেশের উপায়-উপাদানকে সে যুগের উপযোগী করে কল্যাণের পথে ব্যবহার করেছে। সর্বোপরি তারা শান্তি ও সুবিচারের এমন সুষ্ঠু ব্যবস্থা কায়েম করেছিল যা ইসলামের সত্যিকার শান্তি ও সুবিচার থেকে অনেক নিন্মমানের হলেও ইতিপূর্বেকার এবং আশপাশের দেশগুলোর অবস্থার তুলনায় অনেক খানি ঊঁচুস্তরের ছিল। অতঃপর তারাও পূর্ববর্তীদের ন্যায় পথভ্রষ্ট হতে লাগল এবং তাদের মধ্যেও গঠনমূলক কাজের যোগ্যতা কমে যেতে লাগল এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের প্রতি ঝোঁক প্রবণতা বেড়ে চলল। তারাও উঁচু-নীচু, বংশ মর্যাদার শ্রেণী বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের সমাজ ও জাতিকে খণ্ড বিখণ্ড করে ফেলল। এজন্য চারিত্রিক, রাজনৈতিক, তামাদ্দুনিক ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষতি হয়েছে। তারাও ইনসাফের তুলনায় যুলুম, নির্যাতন অনেক বেশী করতে লাগল। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে গিয়ে তারা শুধু তাত্থেকে স্বার্থসিদ্ধি এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে অবৈধ স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টায় মেতে উঠল। উন্নতি ও সংস্কারমূলক কাজ ছেড়ে দিয়ে তারাও আল্লাহ্ প্রদত্ত শক্তি ও উপায় উপাদান নষ্ট করতে এবং সেগুলোকে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে ব্যবহার করতে লাগল। দৈহিক আরাম ও ভোগ লালসায় তারা এতই মত্ত হয়ে গেল যে, তাদের শাসন কর্তাদেরকে যখন দিল্লীর লাল কেল্লা থেকে পলায়ন করতে হয়েছিল, তখন তাদের শাহজাদারা-যারা গতকাল পর্যন্ত সিংহাসনের দাবীদার ছিল-নিজেদের জীবন রক্ষার জন্য পলায়ন করতেও পারেনি। কেননা মাটির উপর দিয়ে চলার অভ্যাস তারা পরিত্যাগ করেছিল। মুসলমানদের সাধারণ নৈতিক চরিত্রের চরম অধঃপতন হয়েছিল। একেবারে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বড় হোমরা চোমরা দায়িত্বশীল লোকদের পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুরই পরোয়া ছিল না। ফলে ধর্ম, জাতি ও দেশকে অন্যের হাতে বিকিয়ে দেয়ার পথে তাদেরকে বাধা দেয়ার মতো আর কিছুই রইল না। তাদের মধ্যে জন্ম নিলো লাখো লাখো পেশাদার সিপাই। এদের নৈতিক চরিত্র ছিল পোষা কুকুরের মতো। যে কেউ খাবার দিয়ে এদেরকে পুষতে পারত এবং তারপর এদের দিয়ে ইচ্ছামত শিকার করাতে পারত। এদের মধ্যে এই অনুভূতি ছিলনা যে, এই ঘৃণ্য পেশার বদৌলতেই শত্রুরা তাদের সাহায্যে তাদেরই জয় করেছে -এর একটি জঘন্যতম দিক আছে। গালিবের মতো কবিও এ সম্পর্কে গর্ব করে বলেছনঃ “শত পুরুষ থেকে বাপ দাদার পেশা হলো সৈনিক বৃত্তি।” এতবড় একজন কবি একথা বলার সময় এতটুকুও ভাবতে পারেননি যে, পেশাধারী সৈনিকবৃত্তি গর্বের বিষয় নয়; লজ্জায়মরে যাবার জিনিস।

মুসলমানেরা যখন এহেন অবস্থায় পৌঁছল, তখন আল্লাহ্ তাদেরকে ক্ষমতাচু্যত করার সিদ্ধান্ত করলেন এবং গোটা ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতা আবার নতুন প্রার্থীদের হাতে যাওয়ার সুযোগ এলো। এ সময় দেশে মারাঠা, শিখ, ইংরেজ ও কতিপয় মুসলমান নেতা এই চারজন প্রার্থীকে দেখা যাচ্ছিল। জাতীয়তাবাদের নেশা ও স্বজাতির প্রতি অন্যায় পক্ষপাতিত্ব থেকে মন ও মগযকে মুক্ত ও পবিত্র রেখে ন্যায়ভাবে তখনকার ইতিহাস ও পরবর্তী অবস্থা পর্যালোচনা করলে আপনার বিবেক একথা স্বীকার করবে যে, তখন গঠনমূলক কাজের যে যোগ্যতা ইংরেজদের ছিল তা অন্যকোন প্রার্থীর ছিল না এবং ইংরেজদের ভেতর যে পরিমাণ ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ছিল তার চেয়ে ঢের বেশী ছিল মারাঠা, শিখ ও মুসলমান প্রার্থীর ভেতর। ইংরেজরা যা কিছু গঠনমূলক কাজ করেছে তা অন্যান্য জাতিরা করত না। তারা যা কিছু নষ্ট করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশী অন্যেরা নষ্ট করত। সাধারণভাবে দেখলে ইংরেজদের ভেতর বহু দিক দিয়ে অগণিত দোষ ও অন্যায় পাওয়া যাবে। কিন্তু তুলনা মূলকভাবে বিচার করলে তাদের সমকালীন প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে তাদের অন্যায় অত্যাচার অনেক কম এবং গুণ-গরিমা বেশী পাওয়া যাবে। এই জন্যই তো আল্লাহর আইন আরেকবার মানুষের মনগড়া নীতির মূলোচ্ছেদ করলো। মানুষ বিনা অধিকারে এই নীতি রচনা করেছিল যে- “প্রত্যেক দেশের অধিবাসীগণ সে দেশের মালিক, তারা তাদের ইচ্ছামত দেশকে গড়তেও পারে, ভাঙ্গতেও পারে।” আল্লাহর আইন ইতিহাসের এই চিরন্তন ফয়সালা থেকে প্রমাণ করেছে যে- না, দেশ এক মাত্র আল্লাহর, এর পরিচালনার ভার কাকে দেয়া হবে এ ফয়সালা তিনিই করবেন, এ ফয়সালা কোন বংশ, জাতি অথবা পিতা-প্রপিতার অধিকারের ভিত্তিতে হয় না। বরং কোন্ কোন্ পরিচালনায় সামগ্রিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে, সে দিকে নজর রেখেই এ ফয়সালা গৃহীত হয়।

قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاء وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاء وَتُعِزُّ مَن تَشَاء وَتُذِلُّ مَن تَشَاء بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَىَ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ. – سورة آل عمران26

“বলুন, হে আল্লাহ্! দেশের মালিক! তুমি যাকে ইচ্ছা তাকে রাজ্য দিয়ে থাক এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নিয়ে থাক এবং যাকে চাও তাকে সম্মান এবং যাকে চাও লাঞ্ছনা দিয়ে থাক। তোমারই হাতে রয়েছে সব মঙ্গল। তুমি নিঃসন্দেহে সব কিছু করার ক্ষমতা রাখ।” [সূরা আলে ইমরানঃ ২৬]

এভাবেই হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে একটি জাতিকে আল্লাহ্ এ দেশে নিয়ে এলেন। এরা এ দেশে সংখ্যায় তিন চার লাখের বেশী কোন সময়ই ছিল না। কিন্তু এরা এখানকার উপায়-উপাদান ও মানুষ দিয়ে এ দেশের হিন্দু, মুসলমান, শিখ ইত্যাদি সমস্ত শক্তিকে পরাজিত করে দেশের শাসন ক্ষমতা দখল করল। এ দেশের কোটি কোটি অধিবাসী এ মুষ্টিমেয় ইংরেজদের অধীন হয়ে রইল। একজন ইংরেজ একাই একটি জেলা শাসন করেছে। তাও এমন অবস্থায় যে, এ কাজে তার হাত শক্তিশালী করার মতো তার জাতির কোন লোক এখানে ছিল না। এসময় এ দেশের লোকেরা যা কিছু করেছে তা সবই চাকর হিসেবে করেছে- কার্যকারক হিসেবে নয়। ইংরেজদের শাসনামলে এ দেশে যেসব গঠনমূলক ও উন্নয়ণমূলক কাজ হয়েছে, তা তাদের দ্বারা এবং তাদের প্রভাবেই হয়েছে- এ কথা আমাদের সবাইকে স্বীকার করতে হবে। অস্বীকার করলে সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হবে। তারা যে অবস্থায় এদেশের শাসন ক্ষমতা হাতে নিয়েছিল, তার তুলনায় আজকের অবস্থা দেখলে এ কথা স্বীকার করার জো নেই যে, তাদের অনিষ্টকারিতা সত্ত্বেও অনেক গঠনমূলক ও উন্নয়ণমূলক কাজ হয়েছে। এসব কাজ এদেশবাসীর দ্বারা সম্পন্ন হওয়ার কোন আশাই ছিল না। এ জন্যই তো আল্লাহ্ আঠার’শ শতাব্দীর মাঝখানে এ দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, তা মোটেই ভুল ছিল না।

এখন দেখুন, ইংরেজরা যা কিছু গড়তে পারত তা গড়েছে আর বিশেষ কিছু তাদের দ্বারা গড়ে উঠতে পারে না। এখন তারা যা গড়তে পারে তা অন্যের দ্বারাও সম্ভব। ওদিকে তাদের ধ্বংসকারিতার বহর খুব বেড়ে গেছে। আর যতদিন তারা এ দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবে, ততদিন গড়ার চেয়ে ভাঙ্গবেই বেশী। তাদের অন্যায় ও অপরাধের ফিরিস্তি এত দীর্ঘ হয়েছে যে, তা এক বৈঠকে বর্ণনা করা মুশকিল। আর সেগুলো বর্ণনা করার কোন প্রয়োজনও নেই। কারণ, সেসব সবার চোখের সামনেই রয়েছে। তাদেরকে এখন এ দেশের শাসন ক্ষমতা থেকে বেদখল করাই আল্লাহর সিদ্ধান্ত। তারা নিজেরাই সোজাভাবে এ দেশ থেকে বিদায় নিতে প্রস্তুত হয়ে বেশ বুদ্ধিমানের কাজ করেছে।

সোজাভাবে না গেলে বাঁকাভাবে তাড়িয়ে দেয়া হতো। কারণ, আল্লাহর চিরন্তন আইন এখন আর তাদের হাতে এ দেশের শাসন ক্ষমতা রাখার পক্ষপাতি নয়।

দুনিয়ার প্রকৃত মালিক কোন দেশে এক প্রকার পরিচালনা ব্যবস্থা খতম করে অন্য প্রকার ব্যবস্থা কায়েম করার ব্যবস্থা করলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, আমরা এখন তারই দ্বারদেশে দাঁড়িয়ে আছি। এটা ইতিহাসের একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাহ্যদৃষ্টিতে এ দেশে যেভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হতে দেখা যাচ্ছে তাতে কেউ যেন এ প্রতারণায় না পড়েন যে, দেশের শাসনক্ষমতা দেশবাসীর হাতে দেয়ার এই যে সিদ্ধান্ত হচ্ছে তা একেবারে চূড়ান্ত ও চিরন্তন। বর্তমান পরিস্থিতির একটা সহজসাধ্য রূপ হয়তো আপনারা অনায়াসেই অনুধাবন করতে পারছেন যে, বিদেশ থেকে এসে যারা এ দেশ শাসন করছিল, এখন তারা নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছে। কাজেই এখন স্বাভাবিকভাবেই দেশের ক্ষমতা দেশবাসীর হাতে আসাই উচিত। আসলে কিন্তু তা নয়। আল্লাহর সিদ্ধান্ত এরূপ হয় না। তিনি এই বিদেশীদেরকে পূর্বেও অকারণে আনেননি, আবার এখনো বিনা কারণে সরিয়ে দিচ্ছেন না। পূর্বে যেমন তিনি আপনাদের কাছ থেকে খামখেয়ালীভাবে শাসনক্ষমতা কেড়ে নেননি, তেমনি এখনো আপনাদেরকে খামখেয়ালীভাবে এ ক্ষমতা দেবেন না। আসল ব্যাপার এই যে, বর্তমানে ভারতবাসীরা ক্ষমতার প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছে; হিন্দু, মুসলমান, শিখ সবাই প্রার্থী। যেহেতু এরাই দেশে প্রথম থেকে বসবাস করে আসছে, কাজেই তাদেরকেই প্রথম ক্ষমতা লাভের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এটা স্থায়ী নিযুক্তি নয়, বরং তাদের পরীক্ষার জন্যই এ সুযোগ দেয়া হচ্ছে। যদি তারা নিজেদের কার্যকলাপে প্রমাণ করে যে, ভাঙ্গার চেয়ে গড়ার যোগ্যতাই বেশী, তাহলে তাদেরকে এ দেশের শাসন ক্ষমতায় স্থায়ীভাবে নিযুক্ত করা হবে। আর যদি তারা গঠনমূলক কাজের চেয়ে ধ্বংসাত্মক কাজই বেশী করে, তবে তার পরিণাম খুব শিগগিরই ভোগ করবে। এ অবস্থায় তাদের কাছ থেকে এ দেশের শাসনক্ষমতা কেড়ে নিয়ে অন্য কোন জাতিকে এ কাজের জন্য নির্বাচিত করা হবে। অতঃপর আর তারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগই করতে পারবে না। সমগ্র দুনিয়ার সম্মুখে নিজেদের অযোগ্যতার স্পষ্ট প্রমাণ দেয়ার পর তারা কোন মুখে অভিযোগ করবে? নাছোড়বান্দা হয়ে অনুনয় বিনয় করলেও তা শুনবেই বা কে?

এখন আপনারা একটু পর্যালোচনা করে দেখুন যে, এ দেশের হিন্দু-মুসলমান ও শিখ এ পরীক্ষায় আল্লাহর সামনে নিজেদের এমন কি যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, গুণ-গরিমা এবং কার্যকলাপ পেশ করেছেন যে, তার ফলে আল্লাহ্ তাঁর দেশের শাসন ক্ষমতা আবার তাদের হাতে সোপর্দ করবেন বলে তারা আশা করতে পারেন। হিন্দু, মুসলমান ও শিখদের অপরাধগুলো নৈতিকতার আদালতে পেশ করলে তারা সবাই দোষী সাব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমি যদি এখন নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে সুস্পষ্টভাবে সেগুলো বলে দেই, তাহলে আশা করি আপনারা খারাপ মনে করবেন না। নিজের জাতি ও স্বদেশী ভাইদের দোষ বর্ণনা করা আমারও ভাল লাগে না। আসলে আমার হৃদয় এতে কাঁদে। কারণ, আমি তাদের এ সমস্ত দোষ ও অপরাধের মারাত্নক পরিণাম যেন স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। তাদেরকে শিগ্গিরই এ পরিণামের সম্মুখীণ হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। এসব দোষ ও অপরাধ তাদেরকে ধ্বংস করবে বলে আমার আশংকা হচ্ছে। আমি, আপনি কেউই এ মারাত্মক পরিণাম থেকে বাঁচতে পারবো না। এজন্য আমি অন্তরের বেদনা নিয়ে এগুলো বিবৃত করছি। এর ফলে যার কান আছে সে শুনে সংশোধনের কিছুটা চিন্তা করতে পারবে।