শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সাহিত্যে প্রগতি

সাহিত্য চিরকালই প্রগতিশীল। প্রগতি সাহিত্যের মৌল ধর্ম-স্বাভাবিক প্রবণতা। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক-এক সময় এক-একজন দিক্পালের আবির্ভাব ঘটে, যিনি সাহিত্যকে নব ধারায় প্রবাহিত করেন। ফলে সাহিত্যে যেমন গতানুগতিকতা টিকতে পারে না, তেমনি থাকেনা স্থবিরতা ও অনগ্রসরতা। সাহিত্যে সৃষ্ট হয় নবতর রস ও প্রবাহ। কেননা কোন সাহিত্যিকই সাধারণভাবে প্রগতি-বিরোধী হন না। কাল ও প্রেক্ষিতের পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজ-বিকাশের সঙ্গে তাল রেখে নিত্য-নব উন্মেষিত ভাবধারাকে সম্বল করে তিনি সৃষ্টি করেন নবতর সাহিত্য। পদ্ধতি, স্টাইল ও দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে ভিন্নতা ও পাথর্ক্য সাহিত্যের ভাণ্ডারকে পরিপূর্ণ করে তোলে। ফলে সাহিত্য অতীতকে অনেক পশ্চাতে ফেলে সম্মুখের দিকে এগিয়ে যায় দ্রুত গতিতে। তাই সাহিত্যে প্রগতি অনস্বীকার্য।

তবে প্রগতি সম্পকির্ত ধারণা সব সময় একইভাবে অনড় ও স্থিতিশীল থাকেনা। তা চিরকালই পরিবতির্ত হয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও পরিবর্তিত হতে থাকবে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে আজ যেসব মূল্যমানের প্রশংসায় সমাজ উচ্চকণ্ঠ, আকামীকালকেই তা হতে পারে পরিত্যক্ত। সাহিত্যে যৌনতার চর্চা অতি প্রাচীন; কিন্ত তার সীমালঙ্ঘনমূলক বা অত্যধিক প্রয়োগ সুস্থ মন-মানসিকতার অনিবাযর্ভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে; ফলে ক্রমে তা সাহিত্যের অঙ্গন থেকে বিলীন হয়ে যায়, যেমন ফাল্গুনের ছোঁয়ায় গাছ থেকে ঝরে পড়ে পুরাতন পত্রপল্লব। তা কোন স্থায়ী মূল্যমানের ধারক হয়না বলে শ্রেয়বোধের তাড়নায় আপনা-আপনি খসে পড়তে বাধ্য হয়।

এক কালে ‘শিল্পের জন্যেই শিল্প’ এই দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল সাধারণভাবে কবি-সাহিত্যিকদের ‘মটো’। পরবর্তীকালে তা পরিত্যক্ত হয় এবং সে স্থান দখন করে নেয় ‘শিল্প জীবনের জন্যে’- এই আদর্শ। কিন্তু সূক্ষ্ণ বিচারে উভয় আদশর্ই অসম্পূর্ণ এবং অযথার্থ। কাযর্কারণের এই জগতে কোন জিনিসই নিজের ‘কারণ’ হতে পারেনা। প্রতিটি সাহিত্য-কর্ম অবশ্যই লক্ষ্যাভিসারী হয়ে থাকে- তা অনুভবযোগ্য হোক আর না-ই হোক। দ্বিতীয়ত বিশ্বলোকের হুবহু চিত্রাঙ্কন  এবং ঘটনাবলীর যথাযথ বণর্নাকে কখনই সাহিত্য নামে অভিহিত করা যায় না। তাতে শিল্পীর নিজস্ব ভাবধারা, দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তার প্রতিফলন একান্তই অনিবার্য। কোন পাঠকই ঘটনার যথাযথ প্রতিবেদনকে সহিত্যের যথাযথ মানে উন্নীত বলে স্বীকার করত রাজী হবেন  না যতক্ষণ না তাতে সাহিত্যস্রষ্টার কল্পনার চিত্তাকর্ষক রং মিশ্রিত হয়। একজন সুসাহিত্যিক শুধু এটুকু বলেই ক্ষান্ত হতে পারেননা যে, ‘বস্তুটি কি’ বরং কি হওয়া উচিত বা কি হতে পারতো তা বলাও তাঁর নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন। এটা তাঁর গভীর মননশীলতা ও চিন্তাশীলতার বিশেষত্ব। অন্যকথায় সাহিত্য জীবনের শুধু দর্পনই নয়, তা জীবন-কাফেলার পথ-প্রদর্শকও। জীবনের গতির সাথে তাল রেখে চলাই তাঁর ধর্ম নয়, জীবনকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্বও তারই। নিছক বস্তুনিষ্ঠ রচনার প্রাচীরের ওপর আসীন হয়েই প্রগতি বিপ্লব বা পশ্চাদপদতার ছবি তোলা যেতে পারে না। সমাজের পরিবর্তনকামী সাহিত্যই জীবন্ত ও শাশ্বত।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সৌন্দর্যবোধ, কল্পনাপ্রবণতা, ব্যবহারিকতা, বাস্তবতা ও সামষ্টিকতা একই সত্যের বিভিন্ন প্রকাশ মাত্র। এগুলোর সাযুজ্যই শিল্প বা সাহিত্যকে পূর্ণ রূপে ও উচ্চ মানে উন্নীত করতে পারঙ্গম। একজন সফল সাহিত্যিক বা শিল্পী আমাদের সৌন্দর্য-বোধকে শুধ চরিতার্থ করেন না, আমাদের চিন্তার রুচিশীলতা ও কর্মের প্রেরণাকেও গতিশীল রাখেন। আমরা যেমন ‘কাল’কে প্রভাবিত করি, তেমনি কালও প্রভাবিত হয় আমাদের দ্বারা। সফল সাহিত্যিক কাল-স্রোতে ভেসে যাওয়াতেই মনুষ্যত্বের সার্থকতা নিহিত বলে মনে করেন না; বরং কাল-স্রোতের গতি পরিবর্তন করে তাকে স্বনির্ধারিত লক্ষ্যপানে প্রবাহিত করাকে নিজের একটা বড় কর্তব্য বলেও মনে করেন।

চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে অতিশয় গুরুত্বের অধিকারী। স্বাধীনতা ব্যক্তির জন্মগত অধিকার, তা-ও কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু স্বাধীনতার যথার্থ তাৎপর্য অনুধাবন এবং তার নীতিমালা ও রূপরেখা নির্ধারণ যার-তার কর্ম নয়। Freedom means resonsibility বা ‘স্বাধীনতার অর্থ দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যপরায়নতা’ একথা অবশ্যই স্বীকৃত।

এইদৃষ্টিতে বলা যায়, নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও হৃদয়াবেগ প্রকাশের  পূর্ণ স্বাধীনতা প্রত্যেক সাহিত্যিকেরই মৌলিক অধিকার বিশেষ, একথা সত্য; কিন্তু তা একটা নিয়মতান্ত্রিকতা ও নৈতিকতার বিধান দ্বারা অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। মানব জীবনে এমন সব অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রে ঘটে, যা পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ করা হলে আমাদের সৌন্দর্যবোধ ও সূক্ষ্ণ হৃদয়াবেগ নিঃসন্দেহে ক্ষুণ্ন ও আহত হবে। অতএব যে বক্তব্য কেবল পাশবিক কামনা-বাসনাকেই উত্তেজিত করে, তা কখনোই সার্থক ও স্থায়ী মূল্যমানসম্বলিত সাহিত্য পদবাচ্য হতে পারে না। কিন্তু তাই বলে সাহিত্যে যৌন-সম্পর্কের একদম প্রবেশাধিকার থাকবেনা, এমন কথা নয়। অনেক সময় রোমান্টিক গল্প, উপন্যাস বা কবিতায় যৌন-সম্পর্কের প্রয়োগ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কেননা আমাদের জীবন-বৃক্ষের শিকড় যৌন কামনার মৃত্তিকা-গভীরে বিস্তীর্ণ হয়ে আছে। কিন্তু সাহিত্যে যৌন-সম্পর্ককে উপস্থাপন করতে হবে অত্যন্ত শালীন ও রুচিসম্মতভাবে, তার অশ্লীল ও নগ্নভাবে উপস্থাপন সাহিত্যের মান সংরক্ষণে কখনই সহায়ক হতে পারে না। [নরনারীর যৌনসম্পর্কের বিষয় পবিত্র কুরআনেও উল্লেখিত হয়েছে সে উল্লেখ এতই শালীন  শোভন যেতা পাঠক চিত্তে কোনরূপ ক্ষতিকরপ্রভাব বিস্তার করেনা আমাদের সাহিত্য চর্চায়ও কুরআনের এই দৃষ্টিভঙ্গিই অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়– সম্পাদক]

আসলে মানব জীবনের অন্যান্য সব দিকের ন্যায় সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ঐতিহ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ঐতিহ্যকে বাদ দিযে যে সাহিত্য, তা যেমন কালজয়ী হয়না, তেমনি তা মানুষের কোনরূপ কল্যাণ সাধনে কিংবা মানব মনে কোন মহৎ প্রেরণা ও কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হতে বাধ্য। মানুষের ঐতিহ্য তার অস্তিত্ব ও ইতিহাসের মূলদর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তার অস্তিত্বের মূলদর্শন হলঃ মানুষ এই বিশ্বলোকে উদ্দেশ্যমূলক এক বিশেষ সৃষ্টি। এখানে তার বিশেষ মর্যাদা তার এই বিশেষ জন্ম-সত্যেরই স্বাভাবিক ফসল। কাজেই বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক সৃষ্টি হওয়ার কারণে সে উদ্দেশ্যের বাস্তবায়নে তার গোটা জীবনই নিবেদিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তার সাহিত্য যখন সে উদ্দেশ্যের পরিপূরক হয়ে দেখা দিবে তখনই মানব সমাজে তা সাগ্রহে গৃহীত ও আদৃত হবে এবং গণ-মানুষের জন্যে অফুরন্ত কল্যাণ বয়ে আনবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে সাহিত্য মানুষের এ ভাবধারার পরিপোষক নয়, যে সাহিত্য মানুষকে হিংস্রতা পাশবিকতা বা লালসার প্রতিমূর্তি হিসেবে উপস্থাপন করে, সমাজে নিয়ম-শৃংখলার পরিবর্তে উচ্ছৃংখলতা ও বিপর্যয়ের ইন্ধন যোগায়, তা মানবোপযোগী সাহিত্য হতে পারে না। যেসব রচনা মানুষের মধ্যে যৌন আবেগকে বল্গাহীন করার প্রয়াস পায়, যেসব কবিতা বা গল্প মানুষের স্বাভাবিক লজ্জাশীলতার শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেলে, তাকে নাস্তিকতা ও খোদাদ্রোহিতায় উদ্বুদ্ধ করে, সে সাহিত্য মানুষের কল্যাণের সঠিক বাহন বলে স্বীকৃতি পেতে পারে না।

এই প্রেক্ষিতে সাহিত্যকে অতি সহজে এবং অনিবার্যভাবে দু’ভাগে ভাগ করতে হয়। একটি গঠনমূলক সাহিত্য আর অপরটি বিপর্যয়মূলক সাহিত্য। প্রথমটি মানব-প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে ইতিহাসে মানবতার বিরাট কল্যাণ সৃষ্টিকারী সাহিত্য রূপে চিহ্নিত এবং চিরস্থায়ী মূল্যমানসম্পন্ন আর দ্বিতীয় প্রকারের সাহিত্য যৌন উত্তেজক মাদকের ন্যায় ধ্বংসের কাজ করে এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে; মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি, সুস্থ মন-মানস, পরিচ্ছন্ন চিন্তাধারা এবং পরিশীলিত রুচিবোধকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাই প্রথমোক্ত সাহিত্যের সাথে তার নৈকট্য ও ঘনিষ্ঠতা খুবই স্বাভাবিক; কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারের সাহিত্যের সাথে তার স্থায়ী কোন একাত্মতা অকল্পনীয়।

সাহিত্যের একটা সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকা একান্তই আবশ্যক। লক্ষ্য না থাকলে যে সাহিত্য সৃষ্টি হবে তা ঝরা পাতার মতই ক্ষয়িষ্ণু। বায়ুপ্রবাহে তা একদিক থেকে অন্য দিকে, ওপর থেকে নিচের দিকে তাড়িত হতে বাধ্য। তা বল্গাহীন অশ্বের মত যেদিকে ইচ্ছা উদ্দাম গতিতে ছুটতে শুরু করবে এবং যেখানে ইচ্ছা মুখ লাগিয়ে দিয়ে যা-ইচ্ছা গ্রাস করবে। তার যা ভালো লাগবে, তাতেই সে মন লাগাবে এবং তার প্রশংসায় চারদিক মুখরিত করে তুলবে। তা যেন পাল তোলা নৌকা-হাওয়ার গতিই তার মূল গতি। এই সাহিত্য মানুষকে কোন শাশ্বত মূল্যমান দিতে সম্পূর্ণ অক্ষম বলে তা বিস্মৃতির অতল তলে ডুবে যেতে বাধ্য।

বস্তুত সাহিত্য মানব জীবনের জন্যে অতীব মূল্যবান সম্পদ। সাহিত্য মানুষ ব সমাজের প্রতিবিম্বই শুধু নয়, তা মানুষের চরিত্রও। তাই প্রগতির নামে সাহিত্যকে কলূষিত করার অধিকার কারোরই থাকতে পারে না। কেননা সাহিত্যকে কলুষিত করার অর্থ মানব চরিত্রকে ধ্বংস করা।

বর্তমান সময়ে সাহিত্য কোন্ ভূমিকা পালন করছে তা বিচার করে দেখা একান্তই কর্তব্য। এখনকার সৃজনশীল সাহিত্য যদি বাস্তবিকই মানুষের জন্যে কোন কল্যাণময় অবদান রাখতে অক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে তাকে সেই দায়িত্ব পালনে সক্ষম করে তোলা তো সাহিত্যিকদের দায়িত্ব। একথা সংশ্লিষ্ট সকলেরই স্মরণ করা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।

সাহিত্যে বাস্তবতা

একথা সর্বজন-স্বীকৃত যে, কোন সাহিত্যই স্থান-কালের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। সাহিত্য সাহিত্যের জন্যে হোক, কি সাহিত্য জীবনের জন্যে-উভয় ক্ষেত্রেই সাহিত্যিককে তার চারপার্শ্বে নিত্য-সংঘটিত ঘটনাবলী ও পরিস্থিতির নিকট থেকে চিন্তার উপকরণ গ্রহণ করতে হয়। মূলত জীবনের বস্তুনিষ্ঠ বিষয়াদির ভিত্তিতেই সাহিত্যিক তার রচনার অবকাঠামো নির্মাণ করেন। অতঃপর দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে সে অবকাঠামোর ওপর রচনার অবয়ব নির্মাণে স্বভাবতঃই পার্থক্য সূচিত হয়। যারা ‘সাহিত্য জীবনের জন্যে’ মতাদর্শে বিশ্বাসী তাঁরা সে অবকাঠামোর ওপর রচনার পূর্ণ অবয়ব নির্মাণ করে বাস্তবতা ও যথার্থতার উপকরণ দ্বারা। পক্ষান্তরে ‘সাহিত্য সাহিত্যের জন্য’ মতাদর্শের ধারকগণ কৃত্রিমতা, চিন্তার উচ্চমার্গতা ও কল্পনার আতিশয্যের সাহায্যে প্রস্তুত উপকরণাদির সমাহারে সে অবকাঠামোর ওপর রচনার প্রসাদ গড়ে তোলেন। তখন রচনাটির অতল গহ্বরে নিহিত বাস্তবতা (Reality) পর্যন্ত দৃষ্টি পৌঁছানোর জন্যে সে কৃত্রিমতা ও কল্পনার আবরণকে উন্মোচিত করা একান্তই অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। তখন  মনে হয, ‘সাহিত্য সাহিত্যের জন্যে’র পক্ষপাতীরা সম্ভবত জীবনের প্রকৃত বাস্তবতার খুব একটা ধার ধারেন না। পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের ঊর্ধ্বে অবস্থিত বিষয়াদিই তাদের রচনাবলীর ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মূলত এটা একটা মস্তবড় বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। বর্তমানে প্রায় সব সাহিত্যিকই এই কথা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। সকলেই অকপটে স্বীকার করবেন যে, সাহিত্য  যে মতাদর্শ ভিত্তিকই হোক-চিন্তার যে ধারারই অনুসারী হোক, জীবনের প্রকৃত বাস্তবতার সাথে তা কোনক্রমেই সঙ্গতিহীন হতে পারেনা।

তাছাড়া সাহিত্য জীবনের শুধু একটিমাত্র দিক বা অংশেরই প্রতিবিম্ব হতে পারেনা। সাহিত্য সমগ্র জীবনেরই ভাষ্যকার। জীবনের সমগ্র রূপই প্রতিফলিত ও প্রতিবিম্বিত হবে সাহিত্যের দর্পনে। ফলে তাতে জীবনের শুধু ভালো-ভালো দিকগুলোরই রূপায়ণ হবেনা, সেই সাথে জীবনের পদস্খলন ও কলংকময় দিকগুলোও সাহিত্যের উপজীব্য হবে। এই কারণে আদর্শবাদী সাহিত্যিকদের রচনাবলীতে অশ্লীলতা ও পাপ-স্পৃহার উল্লেখ থাকবেনা, এমন কথা স্বীকৃতব্য নয়। কেননা, সমাজের পুঞ্জীভূত দোষ-ত্রুটি ও পাপানুষ্ঠানগুলোকে সম্মুখে উপস্থাপন করে তার পর্যালোচনা ও সমালোচনা করা এবং জনমনে এক কলুষমুক্ত ও কল্যাণময় সমাজ গঠনের পিপাসা ও প্রয়োজনীয়তা বোধ তীব্র করে তোলা সাহিত্যের মৌল লক্ষ্য হয়ে থাকে।

ইসলামী আদর্শানুসারী সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সন্দেহ নেই। তারা সাহিত্যে যৌনতা ও অশ্লীলতার উল্লেখ করবেন কি করবেন না আর তার উল্লেখ যদি অপরিহার্যই অনুভূত হয়, তা হলে তা কিভাবে, কতটা এবং তাতে কোন সব সীমা রক্ষা করতে হবে, এ বিষয়ে একটা সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।

বস্তুনিষ্ট সাহিত্য রচয়িতাবৃন্দ পাপানুষ্ঠানাদির যথাযথ উল্লেখকেই বাস্তবতাবাদী ও বস্তুনিষ্ঠ সাহিত্য মনে করেন এবং এই ধারণার ভিত্তিতে সাহিত্যে অশ্লীলতা ও নগ্নতার সয়লাব প্রবাহিত করার আদর্শকে একটি আন্দোলনের রূপদান করেছের। তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে, পাপের প্রচ্ছন্ন ও আসল রূপটিকে নগ্ন করে সম্মুখে উপস্থাপন করা না হলে জনগণ সে বিষয়ে অবহিত হতে পারবে না এবং তা দূর করারও প্রয়োজন বোধ তীব্র হয়ে জাগবেনা তাদের মনে।

বাহ্যত এ যুক্তিকে অকাট্যই মনে হবে। কিন্তু একটু সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিচার-বিবেচনা করলেই সহজেই বুঝতে পারা যাবে, এরূপ যুক্তি দাঁড় করানো পাপানুষ্ঠানের প্রকৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণারই ফসল মাত্র। প্রকৃতপক্ষে পাপানুষ্ঠান কোন প্রচ্ছন্ন ও অদৃষ্টিগোচর ব্যাপার নয়। সেদিকে লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে তার বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বিষয়াদিকে প্রতিভাত করে তোলা একান্তই নিষ্প্রয়োজন। তার যথাযথ রূপায়ন ও বিস্তারিত বর্ণনা শুধু অবান্তরই নয়, মারাত্মক ধরণের দৃষ্টিকটুও বটে। তা এতই বিদিত ও সর্বজন পরিচিত যে, তাকে সাহিত্যের রঙীন পরিচ্ছদে মুড়ে চাকচিক্যময়, আকর্ষণীয় ও লোভনীয় করে তোলা মূল উদ্দেশ্যের পক্ষে মারাত্মকই হয়ে দেখা দিতে পারে অতি স্বাভাবিকভবে। ইসলামী আদর্শবাদের দৃষ্টিতে বলা যায়, এ ধরণের বিষয়ের প্রতি শুধু ইঙ্গিত করাই যথেষ্ট। ‘মল’কে ‘ময়লা’ বললে তা বুঝতে কারোর একবিন্দু অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তা সত্ত্বেও তাকে যখন সোনার চামচে তুলে এনে সবার সম্মুখে পেশ করার চেষ্টা করা হয়, তখন তা শালীনতার সীমা লংঘন করে যায়। যৌনতা ও অশ্লীলতার প্রতি শুধুমাত্র ইঙ্গিত করা হলে সমজদার পাঠকের পক্ষে তা সহজেই বোধগম্য হতে পারে। অতএব, পাপানুষ্ঠানের পূর্ণ দৃশ্যের ছবি অঙ্কিত না হলে সাহিত্যের বাস্তবতা রক্ষা পায়না কিংবা বাস্তবতাবাদী  সাহিত্যের লক্ষ্যচ্যুতি ঘটে, এরূপ বলা সংকীর্ণতারই পরিচায়ক অথবা রচয়িতার পংকিল হৃদয়াবেগের উদ্ঘাটক মাত্র।

উপরন্তু এরূপ তথাকথিত বাস্তবতাবাদী সাহিত্যের চর্চায় হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। এর প্রভাবে চতুর্দিকে পাপানুষ্ঠানেরই প্রাবল্য ও ব্যাপকতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ানোর কথা কেউ-ই অস্বীকার করতে পারেন না। আর তার পরিণতি সমাজ-মানসে, বিশেষ করে যুব চরিত্রের পক্ষে যে কতখানি মারাত্মক হয়ে দেখা দিতে পারে তা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন পড়েনা। তাছাড়া পাপানুষ্ঠানের রসালো চর্চা যে পাপ-স্পৃহাকে অনেকাংশে চরিতার্থ করে তা-ও অস্বীকার করার উপায় নেই।

দ্বিতীয়ত বাস্তবতার সফল ও পুংখাপুংখ চিত্রায়নের জন্যে তার গভীর ও সূক্ষ্ণ অধ্যয়ন একান্ত জরুরী- তা সমাজের কোন সৌন্দর্যমণ্ডিত বাস্তবতা হোক, কি কলংকলিপ্ত। সাহিত্যিক যখন তার রচনায় পাপানুষ্ঠানের পুংখানুপুংণ চিত্রায়নের নীতি অবলম্বন করবেন এবং তার বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা-বিশ্লেষণে দক্ষতা প্রমাণে উদ্যোগী হবেন, তখন তার জন্যে অবশ্যই পাপিষ্ঠ ও দুরাচারী লোকদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রক্ষা করা এবং যে সব পথে সাধারণত এই সব ঘটনা ও কার্যকলাপ সংঘটিত হয়ে থাকে সেই সব পথের প্রতিটি বাঁক ও কোণের সাথে নিবিড় পরিচিতি অর্জন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে। অন্যথায় তাঁর এ চেষ্টা সফল হবে না-তাঁর বাসনা পূর্ণ পরিণত হতে পারবেনা। কিন্তু সচেতন, নীতিনিষ্ঠ ও আদর্বাদী সাহিত্যিকেই কি নিজেকে সেই পথের পথিক বানাতে প্রস্তত হতে পারেন?

পাপানুষ্ঠানের প্রকৃত রস আস্বাদন কেবল তখনই সম্ভব, যখন পাপ-পংকে আকণ্ঠ অবগাহন লাভ কারোর পক্ষে সম্ভব হবে। কিন্তু সেখানেই ব্যাপারটির ভয়াবহতা সীমিত বা নিঃশেষিত নয়, বরং তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব অবশ্যম্ভাবী। সাহিত্যকের নিজের মন-মানসিকতা ও চরিত্র সে প্রভাবকে কখনই এড়িয়ে যেতে পারবেনা। ফলে এর পরিণতি তার নিজের জন্য কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা কল্পনা করাও হয়ত তার পক্ষে সম্ভব নয়।

প্রতিটি মানুষের প্রকৃতিগত অন্যায় ও পাপের প্রতি ঘৃণা এবং ভালো ও কল্যাণের প্রতি আকর্ষণ বোধ স্বভাবতই বিদ্যমান। স্পষ্টত বুঝা যায়, মানুষকে বিচ্যুতি, পদস্খলন ও চরিত্রহীনতার পংকিল আবর্ত থেকে রক্ষা করার এবং উন্নত মানবিক পবিত্রতা ও সদাচরণের পথে পরিচালিত করার জন্যে বিশ্বস্রষ্টার এ এক মহাকল্যাণময় ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা যতদিন সুস্থ ও কার্যকর থাকবে, মানুষ ততদিন নৈতিকতার উচ্চতর মানের প্রতি দ্রুতগতিতে ও ক্রমাগতভাবে উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করতে থাকবে। পক্ষান্তরে এই ব্যবস্থায় যখনই বিকলত্ব বা বিপর্যয় দেখা দেবে, তখন তার নৈতিকতা ও মানবিকতায় ঠিক ততটাই বিপর্যয় দেখা দেয়া অবধারিত। বস্তুত এ এমন এক মহাসত্য যা কেউই অস্বীকার করতে পারে না। এর যৌক্তিকতা বোঝাবার জন্যে খুব বেশী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও অপ্রয়োজনীয়।

দুর্গন্ধময় পরিবেশে ক্রমাগত বসবাস কিংবা তার মধ্য দিয়ে বার বার যাতায়াতের ফলে ব্যক্তির মনে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার ভাবধারা দুর্বল হয়ে পড়ে অতি স্বাভাবিকভাবেই। প্রথম দিক দিয়ে তা যতটা দুঃসহ মনে হতো, শেষের দিকে তা-ই যেন স্বাভাবিক বলে মনে হয়। অনুরূপভাবে পাপানুষ্ঠানের আনুপূর্বিক বর্ণনা-বিশ্লেষণ ও সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ চিত্রাঙ্কনের ফলেও মানুষের চারিত্রিক অনুভূতি ও নৈতিক সৌন্দর্যচেতনা ভোতা হয়ে যায়। অতঃপর পাপের প্রতি তার মনে কোন ঘৃণাবোধ থাকে না, জাগেনা ভালো ও মঙ্গলের প্রতি কোন আগ্রহ-ঔৎসুক্য আর চরম অবস্থা দেখা দেয় তখন যখন তার দৃষ্টিতে পাপ আর পাপ থাকে না। পাপকে পাপ মনে না করার মানসিক অবস্থা রোগকে রোগ মনে না করা কিংবা মারাত্মক রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা না থাকা-তাকে সুস্বাস্থ্যের নিয়ামক মনে করা একই ধরণের সমান মাত্রার মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। পরিস্থিতির এ ভয়াবহতা যে কতখানি সাংঘাতিক, তা ভাষায় বর্ণনা করাও কঠিন। প্রতিটি সচেতন মানুষেরই এই বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা-বিবেচনা করা কর্তব্য।

বস্তুত এরূপ সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ মানুষের আদর্শিক লক্ষ্যের পথে প্রচণ্ড প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। জনগণ খারাপকে খারাপ এবং অন্যায়কে অন্যায় ভাবুক এবং তার মূলোৎপাটনে দায়িত্ববোধ সহকারে তৎপর হোক, সাহিত্যিক মাত্রেরই তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। প্রকৃত কল্যাণ অত্যন্ত প্রবল-অতীব প্রভাবশালী হোক, তা সকলেরই কাম্য। কিন্তু সেজন্যে যে দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করা হয়েছে, তা এই কামনা ও বাসনাকে সফল করতে পারে না। সেজন্যে কেবলমাত্র সে দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয় যা লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। যাতে তা ব্যাহত বা ক্ষুণ্ন হয়, তা নিশ্চয়ই গ্রহণ করা উচিত হতে পারে না।

এই মৌলনীতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে আমাদের সম্মুখে এ মহাসত্য উদ্ঘাটিত হয় যে, প্রতিটি অন্যায় কাজ ও পাপানুষ্ঠানে কিছুটা আনন্দ ও তৃপ্তির সংমিশ্রণ থাকে। ফলে তার অবিকল চিত্র অঙ্কনে শুধু মুখে বা কাগজের ওপর তার উল্লেখের মধ্যেই সেই আনন্দ ও তৃপ্তি সীমিত থাকে না, তার চিত্রায়ণকারী সাহিত্যিক বা শিল্পীও তার প্রভাব বলয়ে জড়িয়ে পড়ে। [সাহিত্যকে বাস্তবধর্মীকরার অজুহাতে আমাদের এদেশেরই কোন কোন কবিসাহিত্যিকের পতিতালয়ে যাতায়াতের ঘটনা কোন গোপন ব্যাপার নয়ফরাসী দার্শনিক অগাষ্ট কোঁতে তো দর্শনের মাহাত্ম্য (?) বুঝানোর নামে পতিতালয়েই পড়ে থাকতেন  ধরণের কবিসাহিত্যিক দার্শনিকরা যে মানবতার জন্যে কতখানি বিপজ্জনকতা সহজেই অনুমেয়সম্পাদকবাস্তবভাবে সে আনন্দ আস্বাদনে উদ্বুদ্ধ হওয়া একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে যুব সমাজ তার প্রত্যক্ষ প্রভাবকে কিছুতেই এড়াতে পারে না। তার অনিবার্য ফল এই দাঁড়াবে যে, মূল লক্ষ্য তো অন্তরালে পড়ে থাকবে সেদিকে কারোরই দৃষ্টি নিবদ্ধ হবে না; বরং যে উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতি অবলম্বিত হয়েছে তা-ই সে উদ্দেশ্যের ওপর আঘাত হানবে ও তাকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেবে। তা সত্ত্বেও বাস্তবতার নামে এহেন বস্তুনিষ্ঠ সাহিত্য রচনা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই সুস্থ বুদ্ধি-বিবেকের পরিচায়ক নয়।

তবু একটি প্রমাণ অমীমাংসিতই থেকে যায়। সাহিত্যিককে মানবীয় জীবনের সমস্যাদি নিয়েই লেখনী চালনা করতে হয় আর তা করতে গেলে মানব জীবনের অপরিহার্য দিক হিসেবে অন্যায় ও পাপানুষ্ঠানেরও উল্লেখ করতে হয়। এরূপ অবস্থায় কোন্ বর্ণনাভঙ্গি ও বিশ্লেষণ-পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে?

প্রশ্নটি জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। তবে তা নিশ্চয়ই এমন নয়, যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানব জীবনের সর্বপ্রকার বাস্তব সমস্যার ন্যায় এই সমস্যাটিরও সঠিক ও যথার্থ সমাধান কুরআন মজীদ থেকেই আমরা পেতে পারি। কুরআন মজীদ এই ধরণের ব্যাপারে সব সময়ই ইশারা-ইঙ্গিতকেই আদর্শিক ভঙ্গি হিসেবে গ্রহণ করেছে; কোন ক্ষেত্রেই খুঁটিনাটির বর্ণনা-বিশ্লেষণের পদ্ধতি গ্রহণের কোর প্রয়োজনই বোধ করেনি। যে সাহিত্যিকই কুরআনী প্রকাশ-ভঙ্গি ও বর্ণণা-পদ্ধতি অবলম্বনের চেষ্টা করবেন, সঠিক ও নির্ভুল পথ তার সম্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠবে; তার ফলে তিনি একটি কলংকমুক্ত পথ ও ভঙ্গি গ্রহণ প্রচেষ্টায় সফলতা অর্জনে সক্ষম হবেন। বিষয়টিকে অধিকতর সুস্পষ্ট করে তোলার মানসে কতিপয় দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা যাচ্ছে, যা প্রত্যেক চিন্তাশীল সাহিত্যিকের জন্যেই যথেষ্ট হতে পারে। আরবী ভাষায় নারী-পুরুষের যৌনমিলনকে বোঝাবার জন্যে অসংখ্য শব্দ রয়েছে। কিন্তু কুরআন সে-সবের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ব্যবহার করেছে এমন একটি শব্দ যার অর্থ ‘স্পর্শ করা’। অপর এক স্থানে এই বিষয়টিকে বোঝানো হয়েছে আবৃত বা আচ্ছন্ন করা শব্দ দ্বারা। স্বামীর পক্ষে স্ত্রীর সান্নিধ্যে যাওয়ার কথা বলেও এই ব্যাপারটিই বুঝানো হয়েছে।

এতদ্ব্যতীত সূরা ইউসুফ-এর একটি অংশে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের বিবাহিতা এক নারীর যৌন আকাংক্ষার তীব্রতা বোঝাবার জন্যে এই বর্ণনাভঙ্গি অবলম্বিত হয়েছেঃ

‘‘ইউসুফ যে মহিলার ঘরে অবস্থান করছিল সে তাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে শুরু করল। একদিন সে দরোজা বন্ধ করে বললঃ এস, এটাই তোমার জন্যে একটা মস্ত সুযোগ। ইউসুফ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলঃ খোদা-ই আমার সহায়। তিনিই আমাকে একটি বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। আর জালিম কখনই কল্যাণ লাভ করতে পারে না। মহিলাটি পূর্ণ সংকল্প গ্রহণ করেছিল। ইউসুফও সংকল্প করে বসতো যদি সে তার খোদার অকাট্য দলীল প্রত্যক্ষ না করত। ঘটনাটির অবস্থা এরূপ হওয়ার কারণ হচ্ছে, পাপ ও অন্যায়কে তার থেকে দূর করাই ছিল আমাদের ইচ্ছা। মূলত সে আমাদের বাছাই করা বান্দাহদের মধ্যকার একজন। শেষপর্যন্ত উভয়ই অগ্রে-পশ্চাতে দরোজার দিকে ধাবিত হল। মহিলাটি পিছন দিক থেকে ইউসুফের জামা দীর্ণ করে দিল…..।’’ (২৩২৫ আয়াত)

সমস্ত ঘটনাটি যে অতীব সূক্ষ্ণ ইশারা ও ইঙ্গিতময় ভঙ্গিতে বর্ণিত হয়েছে, তা সহজেই লক্ষ্যণীয়। মূলত এসব ব্যাপারের উল্লেখ সাধারণত আগুনে তেল ঢালার মতই আবেগপূর্ণ হয়ে থাকে। কিন্তু কুরআন অতীব সংযত ভঙ্গি অবলম্বন করে সে আবেগ-উচ্ছ্বাসপূর্ণ ঘটনাটিকে সর্বপ্রকার ক্ষতিমুক্ত করে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু এই অস্পষ্টতা ও ইঙ্গিতময়তা সত্ত্বেও মূল বক্তব্য অনুধাবন কিছুমাত্র ব্যাহত বা বিঘ্নিত হয়নি।

এই প্রেক্ষিতে সহজেই বলা যায়, আদর্শিক লক্ষ্যাভিসারী লেখক-সাহিত্যিকগণ নিজেদের লেখনীকে ময়লা সজ্জায়নের কাজে ব্যবহার না করে কুরআনী বর্ণনা-ভঙ্গির অনুসরণ করলে মানবীয় লক্ষ্যের মহান মর্যাদা সংরক্ষিত হতে পারে। সেই সাথে মহান আল্লাহর দেয়া লেখনী শক্তিকে তাঁরই নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যবহার করে তাঁর নিকট শেষদিনের জবাবদিহি থেকেও নিজেকে রক্ষা করতে পারা সম্ভব হতে পারে।

বস্তুত আমাদের সাহিত্যকে পাশ্চাত্যের নগ্ন সভ্যতা ও প্রাচ্যের পৌত্তলিক সভ্যতার কলংকময় ভঙ্গি থেকে রক্ষা করার এটাই হচ্ছে সর্বোত্তম মানের সাহিত্যিক আদর্শ। এ আদর্শ আমাদের সাহিত্যিকবৃন্দ এড়িয়ে যাবেন বা এর প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করবেন কোন্‌ কারণে-কোন্ যুক্তিতে?

বস্তুত এ আদর্শ গ্রহণের সাথে সাথে সাহিত্যিকের আদর্শগত মানও হয় উন্নত। তখন তাঁর দৃষ্টিতে ‘সাহিত্য সাহিত্যের জন্যে’ যেমন মিথ্যা, তেমনি ‘সাহিত্য জীবনের জন্যে’ মতটিও সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। কেননা এসময়ে তাঁর মনে যে প্রশ্ন প্রবল হয়ে ওঠে, তা হচ্ছে, ‘সাহিত্য জীবনের জন্যে’ বুঝলাম; কিন্তু জীবন কিসের জন্যে? জীবনের লক্ষ্য কি?…. শুধু বেঁচে থাকার তো কোন অর্থ হয় না। কল্যাণময় জীবন যাপনেরই বা সার্থকতা কোথায়? উদ্দেশ্যবাদ তো কোন একটি পর্যায়ে এসে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে না। লক্ষ্যেরও লক্ষ্য থাকে-উদ্দেশ্যেরও থাকে একটা চরম ও পরম উদ্দেশ্য। তাছাড়া কল্যাণময় জীবনে কল্যাণ কিসে-কিসে অকল্যাণ? আর তা নির্ধারণেরই বা মানদণ্ড কি? এইসব প্রশ্নের জবাবে তাঁকে স্বীকারই করতে হয়, জীবন প্রণোদিত হবে পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। যে জীবন-ধারায় তাঁর সন্তুষ্টি তাতেই নিহিত জীবনের সার্বিক ও পূর্ণাঙ্গ কল্যাণ। তাঁরই অফুরন্ত রহমত লাভ জীবনের একমাত্র চরম লক্ষ্য। নিছক বেঁচে থাকার যে জীবন, তাতে জীবমাত্রই একাকার আর কল্যাণময় ও সুসমৃদ্ধ জীবনও জীবমাত্রেরই কাম্য। কিন্তু মানুষ তো জীবমাত্র নয়। জীবেরও ঊর্ধ্বে মানুষের স্থান ও মর্যাদা। তাই পরম লক্ষ্য ও চরম উদ্দেশ্য হিসেবে তাকে ঘোষণা করতে হয় কুরআনের ভাষায়ঃ

‘‘আমার নামায, আমার ইবাদত-বন্দেগী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবই নিবেদিত সেই মহান আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র সৃষ্টিলোকের অস্তিত্ব দানকারী, লালন-পালনকারী মালিক ও মনিব। তাঁর শরীক কেউ নেই। (তাঁকে এভাবে গ্রহণ করার এবং এতেই সমর্পিত হওয়ার জন্যে) আমি আদিষ্ট। অতএব, সবার আগে আমি নিজেই আত্মসমর্পিত হচ্ছি।’’ (আনআমঃ ১৬২১৬৩)

এই বিন্দুকে কেন্দ্র করেই সাহিত্যিকের জন্যে একটা বৃত্ত রচিত হয় স্বাভাবিকভাবে এবং সাহিত্যিক সেই বৃত্তের মধ্যে থেকেই চালান জীবনব্যাপী অবিশ্রান্ত সাধনা। এই সাধনার ফলে যে সাহিত্য রচিত হয়, তা-ই হয় সার্থক ও শাশ্বত সাহিত্য। এ সাহিত্যের আবেদন একান্তই মানবিক। বস্তুত এই সাহিত্যই মানব জীবনে নিয়ে আসতে পারে অফুরন্ত কল্যাণ। বাস্তবতাবাদী সাহিত্য কিংবা সাহিত্যে বাস্তবতা বলতে এইরূপ সাহিত্যই গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।

সংস্কৃতি

সংস্কৃতির গোড়ার কথা

জীবনের কুল-কিনারাহীন মহাসমুদ্রে মানুষের অস্তিত্ব এক ক্ষুদ্র তৃণখণ্ড সদৃশ মনে হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত বৈচিত্র্য ও সামাজিক উত্তরাধিকারের পার্থক্যের দৃষ্টিতে বহুতর মহাসমুদ্রের ব্যাপকতা ও বিশালতা রয়েছে মানুষের সত্তায়। মানুষ শুধু নিজের আকার-আকৃতি ও সামাজিক উত্তরাধিকার বৈচিত্র্যেরই প্রতীক নয়, বরং ভাষা-সাহিত্য, বিশ্বাস-প্রত্যয়, চিন্তা-পদ্ধতি ও জ্ঞান-বুদ্ধির রকমারি শাখা-প্রশাখারও প্রতিচ্ছবি এই মানুষ। স্পষ্টত মনে হয়, এ বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতাই মাটি-পানির এই জগতের সৌন্দর্য-শোভা। জীবনের স্থিতি ও দৃঢ়তা এ বৈচিত্র্যেরই ফসল।

মানুষের সমাজ-জীবনের ইতিহাস-পূর্বকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যেসব পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং জীবনযাত্রা পদ্ধতি যে বিকাশমান পর্যায়সমূহকে অতিক্রম করে এসেছে, তা দীর্ঘকাল পর্যন্ত মানুষের নিকটই ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। আজও তা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেনি মানুষের সামনে; বরং অস্পষ্টতার এক ছায়াঘন আবরণ তাকে আচ্ছন্ন ও প্রচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমরা যা কিছু জানতে পেরেছি, তা শুধু আন্দাজ-অনুমান বই আর কিছু নয়।

মানুষ এক বিশেষ ধরণের পরিবেশে জন্মগ্রহণ করে। সে পরিবেশ বিশেষ ধরণের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে। জন্ম মুহূর্ত থেকেই নানারূপ জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা ও মিষ্টি-মধুর ভাষা তার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হয়; তার চোখ দেখতে পায় বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি এবং অসংখ্য সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের কর্মতৎপরতা। সে প্রতি মুহূর্তেই পরিবেশ থেকে প্রেরণা লাভ করছে, প্রভাব মেনে নিচ্ছে, প্রভাবান্বিত হচ্ছে এবং অবচেতনভাবে তার ব্যক্তিসত্তা, ব্যক্তিত্ব ও মন-মানস এক বিশেষ ধরণের ছাঁচে ঢেলে গঠিত হচ্ছে। পরিবেশ থেকে গৃহীত এসব প্রভাব তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও প্রতিভা এবং উত্তরাধিকারলব্ধ প্রকৃতির সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে তাকে এক বিশেষ ধরণের ব্যক্তিসত্তায় পরিবর্তিত ও পরিণত করে দেয়। পরিভাষায় একেই বলা হয় সংস্কৃতিবান তথা সভ্য মানুষ (Cultured man)।

মানবতার বিরাট মর্যাদাপূর্ণ প্রাসাদ অবশ্য পাশবিকতার ভিত্তির ওপরই গড়ে ওঠে। অর্থাৎ মানুষ নিশ্নশ্রেণীর পাশবিক গুণ-বৈশিষ্ঠ্যে উৎকর্ষ ও উন্নতি লাভ করে উচ্চতর মানবীয় মূল্যমানে ভূষিত হয়। কেননা বিশ্বস্রষ্টা তাকে বিবেক-বুদ্ধি এবং মন-মানস দিয়ে ধন্য করেছেন। যদিও মানুষের বুদ্ধি-বিবেক (Reason) ও মননশক্তি (mind) খোদার বিশেষ দান, না মানুষ নিজেরই চেষ্টা-শ্রম ও সাধনার ফলে তা অর্জন করে নিয়েছে, এ বিষয়ে একটা বিতর্ক রয়েছে; কিন্তু সে বিতর্ক বাদ দিলেও আমাদের একথা অনস্বীকার্য সত্য।

মানুষ সম্পর্কে দুনিয়ার নানা চিন্তাবিদ নানা মত প্রকাশ করেছেন। ডারউইন (Darwin) তার ক্রমবিকাশ তত্ত্ব দ্বারা প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন যে, জীবতাত্ত্বিক দিক দিয়ে মানুষ সাধারণ পর্যায়েরই একটি জীব বিশেষ। তার শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থা, হজম-রীতি এবং রক্তের প্রবাহও জীব-জন্তুর এসব দিকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমন কি জন্ম-মুহূর্তে মানুষ জীব-জন্তুর মতোই বাক্শক্তিহীন হয়ে থাকে। উত্তরকালে দীর্ঘ সময়-কাল অতিক্রম করার পর তার পরিবেশ থেকে সে বাকশক্তি অর্জন করে। ডারউইন তার বক্তব্য বলিষ্ঠ করার উদ্দেশ্যে একটি আরণ্যক মেয়ের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। মেয়েটিকে ১৭৩১ সনে ফ্রান্সের ক্যালন (CHALON) নামক স্থানে পাওয়া গিয়েছিল। সে কথা বলার পরিবর্তে শুধু চিৎকার করতো। ১৯৫৬ সনে মধ্য-ভারতেও অনুরূপ একটি ঘটনা ঘটে। রামু নামে নেকড়ের একটি বাচ্চা (Ramu the Wolf boy) জঙ্গলে পাওয়া যায়। সেটি ঘাস খেতো এবং জন্তুর মতোই খুব জোরে চিৎকার করতো। বাচ্চাটিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রেখে তার পশুসুলভ আদত-অভ্যাসের গভীর ও সূক্ষ্ণ পযর্বেক্ষণ করে তার মধ্যে মানবীয় আদত-অভ্যাস সৃষ্টির চেষ্টা করা হল। কিন্তু সে চেষ্টা সফল হলনা। বস্তুত সব জীব-জন্তুই আঙ্গিকের দিক দিয়ে পরস্পর সদৃশ্য। অতএব বুদ্ধি-বিবেক, মন-মানস, চিন্তাশক্তি সবই ক্রমবিকাশের ফসল আর তা নিছক শ্রমলব্ধ ও অজির্ত গুণ-বিশেষ।

কিন্তু ডিকার্টে (Descartes) এ থেকে ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, মানুষের মন ও মনন আল্লাহর এক বিশেষ অবদান। এ শক্তি আল্লাহ তা’আলা কেবল মানুষকেই দিয়েছেন; সৃষ্টির মাঝে এ গুণ তিনি আর কাউকেই দেননি। তবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সাহায্যে তাকে অধিক তীক্ষ্ণ ও শাণিত করে তোলা যেতে পারে; তাকে উত্তম পন্থায় প্রয়োগ ও ব্যবহার করা যেতে পারে। মানুষের মন সম্পর্কে চিন্তাবিদ মিল (Mill)-এর অভিমত হল এই যে, তার চিন্তা, গবেষণা ও অনুভূতি অত্যন্ত জটিল এবং ঐন্দ্রজালিক ব্যাপার। মোটকথা, এদের মতে যতই বিভিন্নতা থাকুক না কেন, মানুষের-সে পুরুষই হোক কি নারী- বুদ্ধি-বিবেক ও মন-মানসই হচ্ছে তার শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশিষ্টতার বিশেষ সম্পদ। এর বদৌলতে মানুষ যেমন দুনিয়ার অন্যান্য সৃষ্টি থেকে পৃথক, তেমনি সে বিশিষ্ট ও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। অবশ্য ডারউইন এ বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সহজাত প্রবৃত্তি (Instinct)-র বিশেষত্বই হল এই যে, তা জ্ঞান-বুদ্ধির প্রভাব থেকে মুক্ত থেকেই কাজ করে। জীব-জন্তুর মধ্যে চেতনা তেমন উন্নত ও উৎকর্ষলব্ধ নয়, অথচ মানুষের চেতনা দীঘর্কাল যাবতই উন্নতমানের রয়েছে। মানুষের মগজ (Cerebral cortex) নিত্য-নব অভিজ্ঞতা ও আবিষ্কার-উদ্ভাবনীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে বহুকাল থেকেই; যদিও তার স্নায়ুবিক পদ্ধতি (Nervous system) শুরুতেই নিভুর্লভাবে পৃথককরণ এবং স্মরণ রাখার ব্যাপারে এতো তীক্ষ্ণ শক্তির অধিকারী ছিল না। এ থেকে ডারউইনের ক্রমবিকাশ তত্ত্ব দেহ-কেন্দ্রিক হওয়ার বদলে মন-কেন্দ্রিক হওয়ার দিকে ঘুরছে বলে মনে হয়। যান্ত্রিক অস্ত্রশস্ত্র, বই-পুস্তক, সাহিত্য, চিত্রকলা, ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাস, সুন্দর-সুরম্য প্রাসাদ, সুনীতি ও সুষ্ঠুতা, বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক জ্ঞান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিধি-বিধান, এই পর্যায়ের সব প্রতিষ্ঠানাদি এবং আধুনিক ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা সবকিছুই মানব মনের চিন্তা-ভাবনা ও বুদ্ধি-প্রতিভারই বিস্ময়কর ফসল। এগুলো মানুষ নিরবচ্ছিন্ন চিন্তা-গবেষণা ও অভ্যাস-অনুশীলনের সাহায্যে বতর্মান পুরুষ পর্যন্ত পৌঁছিয়েছে। মানুষের নতুন বংশধরেরা এ উত্তরাধিকারকে, যার নাম সংস্কৃতি, হারাতেও পারে, এর সমৃদ্ধি সাধনও করতে পারে-পারে ভালোভাবে এর সংরক্ষণ করতে।

একেবারে প্রাথমিক কালের অবস্থা লক্ষ্য করলে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, মানুষ সেদিন নিজের পরিবেশে যথেষ্ট পরিবর্তন সূচিত করে পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূল বানিয়ে নিয়েছিল-পরিবেশের সাথে স্থাপন করে নিয়েছিল পূর্ণ সামঞ্জস্য। চক্‌মকির ব্যবহার, গুহা-প্রাচীরের গায়ে (স্পেন ও ফ্রান্সে) চিত্র অঙ্কন ও পাথরের অস্ত্র মানব সমাজে শত-সহস্র বছর পূর্বে প্রচলিত ছিল। পরবতর্তীকালে পশু শিকার-নির্ভর এ আরণ্যক জীবন পরিহার করে মানুষ স্থিতিশীল সামাজিক জীবন যাপন শুরু করে।

মানুষের বুদ্ধি-জ্ঞান, চিন্তা-ভাবনা ও মননশীলতায় যতোই উৎকর্ষ দেখা দিল, মানুষ ততোই আদিম ও আরণ্যক জীবন থেকে দূরে সরে গেল। কিন্তু এসব হল কিভাবে? এ পর্যায়ে কেবল ধারণা –অনুমানই করা চলে, কোন বৈজ্ঞানিক যুক্তি-প্রমাণ-নির্ভর জ্ঞান লাভ করা যায়না।

অবশ্য ক্ষেতে ফসল বোনা, ফসল আহরণ, সূতা কাটা, কাপড় বোনা এবং তামা ইত্যাদি ধাতব দ্রব্যকে ব্যবহারাধীন করে নেয়ার খবর পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে লেখার পদ্ধতি চালু হয়। এর ফলে মানব জীবনে এক মহাবিপ্লব সূচিত হয়। এসব আবিষ্কার-উদ্ভাবনী মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। ক্রমবিকাশমান সংস্কৃতি এরই মাধ্যমে সভ্যতায় পরিণত হয়। আরো পরে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামরিক কার্যক্রমের সাহায্যে তাকে ব্যাপকতর সম্প্রসারিত করা সম্ভব হয়।

আবিষ্কার-উদ্ভাবনীকে এক আকস্মিক ব্যাপারই বলা যায় আর তা হচ্ছে ত্যাগ-তিতিক্ষা, অধ্যবসায় ও অনুসন্ধিৎসার ফসল। তা যখন লোকদের নিকট সমাদৃত হয়, তখন তা-ই সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে; সমাজ-মানুষের চিন্তায়-মননে এবং আদত-অভ্যাসে তার গভীর প্রতিফলন ঘটে। চিন্তা করা যেতে পারে, মানুষ আজ যদি আগুনের ব্যবহার না জানত, কথা বলতে না পারত, খাদ্য ও পোশাকের কোন ব্যবস্থা না হতো, তাহলে মানুষের জীবন কি গভীর শূণ্যতায় ভরে যেত না? এ দুনিয়ায় যত ব্যক্তিসত্তাই জন্ম নেয়, তারা প্রত্যেকেই নিজকে এক বিশেষ প্রাকৃতিক ছাঁচে ঢেলে তৈরী করে নেয় আর এ ছাঁচের গড়নেও দীর্ঘকালের সাধনার প্রয়োজন। তার অভ্যাস, প্রবণতা, মনোভাব, বিশ্বাস, প্রচলন প্রভৃতি সবকিছুই হয় আবিষ্কার-উদ্ভাবনীর মাধ্যম। এটা না হলে ব্যক্তিদের অসভ্য মনে করা যেত। এজন্যে তারা বাধ্য হয়েই উত্তরাধিকার সূত্রে লব্ধ মতাদর্শ ও চিন্তা-বিশ্বাসকে মন-প্রাণ দিয়ে গ্রহণ করে; বরং বলা যায়, তার নিজের বাছাই করে কোন একটাকে গ্রহণ করার পূর্বেই এগুলো তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়।

বস্তুত সংস্কৃতির বিকাশ ও ফলন দৈহিক বর্ধনশীলতা ও বিরাট আকৃতির সাথে অনেকটা জড়িত। পরিবেশ ও পরিবেষ্টনীর প্রভাব, ভালো-মন্দের পার্থক্যবোধ এবং নৈতিক মূল্যমানের আনুকূল্য, দৈহিক ও মানসিক যোগ্যতা ও প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল। দৈহিক আকৃতির তৎপরতা ও সুক্রিয়াশীলতার সাথে কথা বলার গুরুত্বও অপরিসীম। তার জন্যে চিন্তা-ভাবনা, অনুসন্ধান, সমীক্ষণ এবং সচেতন পরিকল্পনা রচনা করা হয়। এসব চিন্তা-ভাবনা ও তত্ত্ব-তথ্যের মাঝে একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তা কখনো ছিন্নভিন্ন হতে পারেনা। কর্মের ওপর শব্দ তার প্রাসাদ নির্মাণ করে এবং প্রাচীনকালে ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল হু, হ্যাঁ ইত্যাদি ধ্বনি থেকেই। আর লেখার উৎপত্তি হতে এসব ঘটনা ও ক্রিয়াকাণ্ডের চিত্র অঙ্কন করতে বহু কষ্ট স্বীকারের প্রয়োজন হয়েছিল অবশ্যই। মিশরীয় শিলালিপি, চিত্রলেখা এবং তার পরিবর্তনগুলোকে ধ্বনি-কেন্দ্রিক নিদর্শনই প্রকাশ করে থাকে। এ থেকেই বর্ণের উৎপত্তি আর এ পর্যায় অতিক্রান্ত হয়েছিল আজ থেকে পাঁচ-ছয় হাজার বছর পূর্বে। এ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, শব্দ মূলতই কাজ ও কর্ম মাত্র আর তার শক্তি সর্বজনবিদিত।

সংস্কৃতির আবেগ ও উচ্ছ্বাসমূলক দিকটি শব্দের সাথে সম্পর্কিত আর বুদ্ধি ও মন হচ্ছে কর্ম, শুধু মাধ্যমেই নয়। কেননা সক্রিয় ও প্রভাবশালী চিন্তা-ভাবনার দ্বারা সংস্কৃতি দানা বেঁধে ওঠে আর চিন্তা, মনোভাব, গবেষণা ও মননশীলতার সাথে শব্দের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এজন্যে নাম ও শব্দের পরস্পর সম্পর্কিত হওয়া আবশ্যক। ধ্বনি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে অনুভূত হয়, যেন কোন একটা জিনিস উপস্থিত করে দেয়া হয়েছে। এভাবে তা বস্তুনিচয়ের সাথে একাত্মতার সৃষ্টি করে। এভাবে এই চেতনা পর্যায়ক্রমিক বিকাশধারায় নিজের জন্যে উপযুক্ত শব্দ ও ভাষার উপাদান সংগ্রহ করতে থাকে। ফলে অস্তিত্ব লাভ করে এক সম্পদশালী ভাষা।

মানব সমাজে ভাষার বিভিন্নতা ও পার্থক্য কেন? তার কারণ এই যে, স্নায়ুবিক প্রক্রিয়া ও জ্ঞানগত ধারণা বিভিন্ন অবস্থা ও ধ্বনির সাথে সম্পৃক্ত। ধ্বনি ও বিশেষ শব্দের পশ্চাদপটের অবস্থা ও পরিস্থিতির মুকাবিলা করার জন্যে যে হাতিয়ার ব্যবহার করা যেতে পারে, তা দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলে যায়। সাধারণ উন্নতি ও ভাষাতাত্ত্বিক জ্ঞান, সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যাপারসমূহের সাথে সাথে আত্মপ্রকাশ করে। এ কারণে ভাষা যে সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাতে কোন সন্দেহ নেই। অস্পষ্ট ও চুপচাপ কথাবার্তা চিন্তার মতোই নিঃশব্দ। যদি শব্দই না থাকে, তাহলে চিন্তা, গবেষণা ও সমীক্ষণও থাকেনা। মানুষ কেবল সজাগ থেকেই চিন্তা করে না, ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায়ও তার চিন্তাকর্ম অব্যাহত থাকে। প্রাচীনকালে মানুষের জন্যে এ দৃষ্টিভ্রম বা অস্পষ্টতা সমধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জাতিসমূহের আকীদা বিশ্বাস, রসম-রেওয়াজ ও নীতি-পদ্ধতির সাথে তাদের স্বপ্নের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান। আর এ জিনিস এমন কারণসমূহের অন্যতম, যার দরুণ সভ্যতার প্রাসাদ উন্নতশির হয়ে দাঁড়িয়েছে। বস্তুত সামগ্রিক, ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক শক্তিসমূহের শুভ সংমিশ্রনেরই অপর নাম হচ্ছে ‘সংস্কৃতি’।

সংস্কৃতির মৌল উপাদান

মানুষের প্রয়োজন-তা আত্মিক হোক কি দৈহিক, রাজনৈতিক হোক কি নৈতিক, ব্যক্তিগত হোক কি সমষ্টিগত, তা সমাজবদ্ধতা ও সংস্থা-সংগঠনের মাধ্যমেই পূর্ণ হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক মানুষের (Man of Nature) কোন অস্তিত্ব নেই, থাকতে পারেনা। তার প্রতিরক্ষা, খাদ্য, গ্রহণ, স্থানান্তর ও গতিবিধি সবই সামগ্রিক সহযোগিতামূলক কাজের ওপর নির্ভরশীল। এ সামাজিক দলবদ্ধতা এমন লোকদের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে, যারা স্থানীয়, দেশীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের সাথে সম্পৃক্ত। তা ছাড়া অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্ম-তৎপরতার দিক দিয়েও তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর হয়েই থাকে। এসব সম্পর্কের ভিত্তিতে তাদের সকলেরই মনজিল এক এবং অভিন্ন। চলার পথও সমান। এ জীবনপথে চলার ব্যাপারে তাদের আচরণও বিশেষ রীতিনীতি ও আইন-বিধানানুগ আর সেগুলোর মৌল উৎস হচ্ছে ধর্মীয় নৈতিক বিধান।

মানুষের আভ্যন্তরীণ গুণাবলীর মধ্যে নীতিবাদিতা, মানসিক আবেগ এবং আল্লাহর ভয় এমন কার্যকারণ, যা বিশেষ অবস্থায় বিশেষ ধরণের আচরণ সৃষ্টির নিমিত্ত হয়ে থাকে। সর্বসমর্থিত মূল্যমান মানুষের আচরণকে প্রভাবান্বিত করে আর তার নির্ভুল ও পূর্ণ বিন্যাস হতে পারে এক বিশেষ ধরণের সংস্কৃতিতে। মনের ইচ্ছা-বাসনা ও আবেগ-উচ্ছ্বাসের পারস্পরিক সংযোজন হতে পারে এসব ব্যবস্থাপনার অধীন। জাতি, সরকার, জাতীয় পতাকা ইত্যাদির পশ্চাতেও অন্তর্নিহিত থাকে জীবন্ত সংস্কৃতির মহাসত্য আর নতুন বংশধরদের মাঝে তার মোটামুটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব জৈবজীবনের বিভিন্ন অভিব্যক্তিতে রূপ পরিগ্রহ করে।

ক্রমবিকাশমূলক চিন্তায় বিশ্বাসী লোকদের মতে সংস্কৃতি ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও ক্রমবৃদ্ধি স্বতঃস্ফূর্ত (Spontaneous) পরিবর্তন ধারার পরিণতি। তা সুসংবদ্ধ মৌল নীতিসমূহের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হয়। তাকে একটির পর একটি পর্যায় ও স্তর অতিক্রম করে অগ্রসর হতে হয়। অগ্নির অস্তিত্ব লাভ, তৈজসপত্র নির্মাণ, অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার এবং তার বিভিন্ন ‘ডিজাইন’, ‘প্যাটার্ন’ ও অর্থনৈতিক উন্নতি একথার প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত।

এসব পর্যায় ও স্তরের পরিব্যপ্তি ও সম্প্রসারণশীলতার (Diffusion) সূচনা কি করে হল, কি করে ও কিভাবে তা ক্রমোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে অগ্রসর হল এবং তার কোথায় কোথায় ও কতখানি পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার সন্ধানের ওপর ঐতিহাসিক চিন্তাবাদের ভিত্তি সংস্থাপিত। সংস্কৃতিকে এভাবেই বিভিন্ন পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়। এজন্যে গোত্র-ভিত্তিক জীবন-ধারা, ধর্মীয় সংঘবদ্ধতা, বস্তুগত ও বৈষয়িক উন্নতি, সামাজিক মূল্যমান ও সামষ্টিক প্রতিষ্ঠানাদি ইত্যাকার বিশেষত্বকে সামনে রেখেই সংস্কৃতিকে বিবেচনা করা হয়। এ সবের বিস্তার যে একই নিয়মে সংঘটিত হতে পারেনি, তা সুস্পষ্ট। বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরণের বিশেষত্ব পাওয়া যেতে পারে বটে; কিন্তু তা সত্ত্বেও বাইরের তথা বৈদেশিক সভ্যতা-সংস্কৃতির যথেষ্ট প্রভাবও তার ওপর প্রতিফলিত হতে পারে। মানুষের নিজস্ব প্রয়োজনাবলী পরিপূরণে আদত-অভ্যাসের বৈচিত্র্যও বিশেষ ধরণের পটভূমির অধিকারী। ছড়ি বা লাঠি অন্ধকার যুগে মাটি খোদাইর কাজে ব্যবহৃত হতো। কালের অতিক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে তার দ্বারা চালনা-দণ্ডের কাজও করা হয়েছে। উত্তরকালে তা আবার ভ্রমণ-ছড়ি রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। আধুনিক যুগে এই ছড়িই উচ্চতর মান-মর্যাদার নিদর্শন। আবার শিক্ষাঙ্গনে তা দৈহিক পীড়নের উপকরণ। এককথায় ছড়ির সঙ্গে যেসব ধারণা ও চিন্তা-বিশ্বাস জড়িত, তা সমাজে প্রচলিত মূল্যমান দ্বারা প্রভাবিত। সোরাহীকে এক কালে পানির সঞ্চয় রক্ষা ও তা শীতল করার কাজে ব্যবহার করা হতো। পরিবর্তিত চিন্তা-বিশ্বাস ও ধারণা-মতবাদ তার ব্যবহারের ওপর সুস্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে সেই সোরাহীই শিল্পীর উচ্চমানের শিল্পকর্মের নিদর্শন হয়ে ড্রয়িং রুমের শো-কেসে স্থান লাভ করেছে এবং লোকদের সৌন্দর্য-পিপাসু মন-মানসের স্পৃহা চরিতার্থ করছে। নৌকার গঠন-প্রকৃতি, তার সংগঠন পরিপক্কতা এবং তাকে কর্মোপযোগী বানানোর কাজে যুগ যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হাজার রকমের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। নৌকা বা জাহাজ নির্মাণ কৌশলে দক্ষতা নৌ-পরিচালনা বিদ্যা ও পদ্ধতি সব কিছুই তার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। অবশেষে বর্তমান যুগে এসে তা একা সর্বাত্মক সৌন্দর্য ও ব্যবহারিক যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

জমির ওপর লাঙ্গল চালানো, বীজ বপন করা ও ফসল তোলা- এই সব কিছুই একটা নিয়ম ও শৃংখলার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এসব তৎপরতা বিভিন্ন যুগে ও বিভিন্ন দেশ-পরিবেশে বিভিন্ন ধরণের পন্থা-পদ্ধতি ও হাতিয়ার অবলম্বন করেছে। এভাবে মানবীয় প্রয়োজন যথার্থভাবে ও পূর্ণ মাত্রায় পূরণ করার একটা বিশেষ ভঙ্গি অস্তিত্ব লাভ করেছে। এগুলোর পারস্পরিক সংমিশ্রণ ও সংযোজন কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের (Traits) পরিণতি নয়; বরং তা সে সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের (Institutions) অবদান যেসব সংস্থা নিজেদের সুসংবদ্ধ ও সুসংহত চেষ্টা-প্রচেষ্টার দরুন এ পর্যায়গুলো অত্যন্ত সাফল্যের সাথে অতিক্রম করেছে। একটি জিনিসের ব্যবহারের সাংস্কৃতিক পটভূমি (Cultural Context), চিন্তা-ভাবনা, প্রচলন এবং আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা (Attachment) অনিবার্য- তা কোন ব্যক্তির দ্বারাই ব্যবহৃত হোক, কি কোন সমাজ সমষ্টি কর্তৃক। ছড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণ, তার ওপর নানা রূপ নকশা অংকন ও চাকচিক্য বৃদ্ধিতে একটি সাংস্কৃতিক, আনুষ্ঠানিক, ঐতিহ্যিক ও ধর্মীয় সম্পৃক্ততা বলিষ্ঠভাবে বর্তমান আর তা-ই তার মৌলিক ব্যবহারের ওপর পরিব্যাপ্ত।

সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ নিজেদের তৎপরতাকে বিভিন্ন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের কাজে ব্যবহার করে থাকে আর এই উদ্দেশ্য লাভের জন্যেই সে সব সংগঠন গড়ে তোলা হয়। তাতে জীবন-জীবিকা, বংশানুক্রম, প্রতিরক্ষা ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা থাকার গুরুত্ব সর্বাগ্রগণ্য। অর্থনৈতিক উন্নতির জন্যে ধনসম্পদ বিনিয়োগ, উপায়-উপকরণের ব্যবহার, হাট-বাজার, যোগাযোগ ও নিয়ম-নীতি-পদ্ধতি গড়ে ওঠে আর নিত্যকার ব্যস্ততার মধ্যে মাছ-ধরা, বাগান রচনা, পশু পালন, বন্য পশু শিকার ও চাষাবাদ এর মধ্যে শামিল। এসবের সাহায্যেই আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় হয়ে থাকে।

পরিবার সংস্থা

বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যে একটি পারিবারিক বা ঘরোয়া পরিবেষ্টনীর একান্ত প্রয়োজন। পরিবার পরিবেষ্টনী একটি সংক্ষিপ্ত একক (Unit)। আইনগত ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও বংশানুক্রমিক মূল্যমানের (values) ওপর এই পরিবার পরিবেষ্টনীর ভিত্তি সংস্থাপিত। পরিবার পরিবেষ্টনী একটি ক্ষুদ্রায়তন সংস্থা। প্রচার ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা এই পরিবার পরিবেষ্টনীর ওপরই নির্ভরশীল।

বিভিন্ন ভঙ্গি, প্রয়োগ পদ্ধতি, ধরন-ধারণ, দ্বীনী চিন্তা-চেতনা, নৈতিক মূল্যমান, দাম্পত্য জীবন, সামাজিক দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ উত্তরাধিকার নিয়মে এক বংশ থেকে আর এক বংশে উত্তরিত হয়। এর সংরক্ষণের জন্যে নিম্নোদ্ধৃত পদক্ষেপসমূহ জরুরীঃ

১. ব্যভিচার বা বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধকরণ।

২. পারিবারিক দায়িত্বসমূহের মান-সম্ভ্রম রক্ষা ও সামাজিক কর্তব্য পালন।

৩. পারিবারিক আইন-বিধান ও নিয়ন্ত্রণ পূর্ণ মাত্রায় প্রতিফলন।

ব্যভিচার তথা অবৈধ যৌন সম্পর্কের ফলে একদিকে বংশগত পবিত্রতা বিনষ্ট হয়, অপরদিকে গোটা সমাজ-পরিবেশে নোংরামী, পংকিলতা, নগ্নতা, নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা ও পারস্পরিক হিংসা-দ্বেষ, শত্রুতা, নরহত্যা ও রক্তপাত ব্যাপকভাবে সংঘটিত হয়। পারিবারিক ও বংশীয় একত্ব ও ঐতিহ্য চূর্ণ হয়ে বংশের ধারা ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। আত্মীয়তা এবং তার মান-সম্ভ্রম ক্ষুণ্ন ও বিলীন হয়। যে সমাজে ব্যভিচার সমর্থন পায়, তা অনিবার্যভাবে উন্নত মানবীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যমান থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়। সেখানে ব্যক্তিদের মধ্যে স্বার্থপরতা, হিংসা-বিদ্বেষ ও আত্মকেন্দ্রিকতার পরিবেশ জেগে ওঠে; ফলে সামাজিক উন্নতি ও বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়।

পাশ্চাত্য দেশসমূহে প্রেমাভিসার বা কোর্টশিপ (Court Ship) প্রচলনের মূল উদ্দেশ্য যা-ই থাকনা কেন, বর্তমান যুগে ও পরিস্থিতিতে সে উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেছে এবং এখন তা নিতান্তই কাম-লিপ্সা ও যৌন-স্পৃহা চরিতার্থ করার একটা প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ফলে পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা ও সম্ভ্রম এবং মানসিক স্থৈর্য ও শান্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। ব্যভিচারের এই ব্যাপকতা দৈহিক রোগ-ব্যাধির মারাত্মক প্রকোপ সৃষ্টি করেছে [পাশ্চাত্যের তথাকথিত উদার  যৌনশিথিল সমাজে ব্যভিচারের প্রাবল্য একদিকে পরিবারব্যবেস্থাকে প্রায় অকার্যকর করে দিয়েছে অপরদিকে এইডস (AIDSএরন্যায় ভয়াবহ যৌনব্যাধি মানব জাতির অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছে  কারণে সেখানকার চিন্তাশীল ব্যক্তিরা এখন এইডসএর প্রতিরোধের জন্যে পরিবার ব্যবস্থার সুরক্ষা  যৌন পবিত্রতা সংরক্ষণের উপর সবচেয়ে গুরুত্ব আরোপ করছেন– সম্পাদকএবং আত্মিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিচারে চরম অধঃপতন ঘটিয়েছে।

পারিবারিক পরিবেষ্টনীকে পবিত্র, সুশৃংখল ও নির্ঝঞ্ঝাট রাখার জন্যে স্বামী-স্ত্রীকে নিজেদের কর্তব্য পালনে পূর্ণমাত্রায় আন্তরিক ও সদাতৎপর হতে হবে। নরনারীর দায়িত্বহীন সম্পর্ক সমাজে নানারূপ জটিল নৈতিক মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে দায়িত্বানুভূতি তিক্ত ও বিষাক্ত মুহূর্তগুলিতে উৎকট মানসিক অবস্থা বিদূরণে সফল সঞ্জীবনীর কাজ করে। এর অনুপস্থিতি জীবনকে একটা স্থায়ী অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করে দেয়।

স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মতানৈক্য বা ভুল বোঝাবুঝি অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু তাদের পারস্পরিক বিবাদ-বিসম্বাদ, মনোমালিন্য ও ঝগড়া-ঝাটি নিতান্তই অবাঞ্ছনীয়। এরূপ অবস্থা দেখা দিয়ে তার প্রতিরোধ ও প্রতিবিধানমূলক আইন-কানুন ও বিধি-বিধানের উপস্থিতি অপরিহার্য। তার সুষ্ঠু প্রয়োগে স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ কার্যকরভাবে রোধ করা এবং পরিবারের লোকদের মধ্যে পূর্ণ মিলমিশ ও মতৈক্য অক্ষুণ্ন রাখা ও কোনরূপ বিভেদ সৃষ্টি হতে না দেয়া সম্ভবপর। লোকদের পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও চেষ্টা-প্রচেষ্টামূলক ভাবধারা জাগিয়ে রাখা একান্তই জরুরী আর তা সম্ভবপর কেবল তখন, যখন ব্যক্তিগত সামষ্টিক স্বার্থের তাগিদে ব্যক্তিগত স্বার্থ কুরবানী দিতে প্রস্তুত হবে-যখন সামাজিক নিয়মবিধির প্রতি সদাজাগ্রত থাকবে অবিচল সম্ভ্রমবোধ। মূল্যমানের (Values) যথার্থ প্রয়োগ একটি প্রাত্যহিক প্রয়োজন আর সম্মিলিত সামাজিক ব্যতিব্যস্ততা ও আমোদ-প্রমোদমূলক অনুষ্ঠানাদিতে নিয়ম-শৃংখলা রক্ষা করা অত্যাবশ্যক। শিক্ষা-প্রশিক্ষণের সাহায্যে লোকদের মধ্যে সভ্যতা-ভব্যতা, শালীনতা, সুষ্ঠুতা ও আদব-কায়দা সংরক্ষণ-প্রবণতার সৃষ্টি করতে হবে। এমনিভাবেই ঐতিহ্যের সাহায্যে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকতে পারে আর এজন্যে অক্ষর বা বর্ণমালাই প্রথম অবলম্বন।

ভাষা-ধ্বনি ও ভঙ্গির ধারক। সাংস্কৃতির অভিজ্ঞতা সেখানে সুপ্রকট। প্রাচীন মানুষের মধ্যে মৌখিক বর্ণনা-ধারার সাধারণ প্রচলন ছিল। কিন্তু উন্নত সংস্কৃতিতে লেখন শিল্পকেও শামিল করা হয়েছে। এক কথায়, সংস্কৃতির উজ্জীবনে অর্থনৈতিক সংগঠন সংস্থা, আইন-বিধান ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ বরাবরই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।

ধর্মবিশ্বাস

জীবনকে সহজ ও সুন্দর করার জন্যে মানুষের মন-মানস তথা বুদ্ধি-বিবেক, চিন্তা-বিবেচনা ও গবেষণা-শক্তি বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে-লাভ করেছে সুদীর্ঘ ও সুব্যাপক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও সম্মুখবর্তী অবস্থা, পরিস্থিতি ও নিত্য-সংঘটিত ঘটনাবলী মানুষকে বিব্রত, দিশেহারা ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেয়। তখন সে হয়ে যায় অসহায় –নিরূপায়। তার অনেক বিদ্যা-বুদ্ধি, চিন্তা-শক্তি ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও সে দিশা করতে পারে না, এখন তার কি করা উচিত!

মানুষ মহাসমুদ্রে চলাচল করার উদ্দেশ্যে বড় বড় জাহাজ নির্মাণ করেছে। এই জাহাজ চালানো জন্যে সে বাতাসের গতির ওপর নির্ভরশীল থাকেনি। সে আপন শক্তি বলেই সমুদ্রের বুকে যে দিকে ইচ্ছা জাহাজ চালিয়ে দিতে সক্ষম। জাহাজের গতি ও স্থিতি পূর্ণমাত্রায় তার নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু হঠাৎ উত্থিত প্রচণ্ড ঝড় ও উত্যুঙ্গ তরঙ্গমালার সম্মুখে সে নিতান্তই অসহায় হয়ে পড়ে। সে সময় তার সব শক্তিমত্তা ও জ্ঞান-বুদ্ধির অক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতাকে সে মর্মে মর্মে অনুভব করে- স্বীকার করে। যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতি অত্যাধুনিক ও শত্রু হননকারী দূরপাল্লার শক্তিশালী অস্ত্রে-শস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে উপস্থিত হয়। তার নিজের বীরত্ব, সাহসিকতা ও যুদ্ধ-কৌশলের ওপর সে পুরোপুরি আস্থাবান। তার সৈন্যসংখ্যা শত্রুপক্ষের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত তাকেই হতে হয় পরাজিত। কিন্তু এটা কেন? এর নির্ভুল জবাব সে সন্ধান করেও জানতে পারে না। তার বিবেক-বুদ্ধি তাকে এ ব্যাপারে কোনই সান্ত্বনা দিতে সক্ষম নয়। কৃষক ক্ষেত্রে-খামারে সোনালী ফসল ফলানোর উদ্দেশ্যে প্রাণ-পণ চেষ্টা করে, নিঃশেষে শ্রম প্রয়োগ করে। হাল হালিয়ে, কোদাল মেরে মাটির বক্ষ সে বিদীর্ণ ও ওলট-পালট করে দেয়। এজন্যে নিজের দেহের রক্ত পানি করে দিতে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলতেও এতটুকু কুণ্ঠিত হয়না। চেষ্টা ও শ্রমেও সে একবিন্দু ত্রুটি থাকতে দেয়না। ফলে সুন্দর শ্যামল ও সতেজ অংকুর ফুটে বের হয়, গাঢ় সবুজে মাঠ একদিক থেকে অন্যদিকে ভরে যায়। সে মনোরম দৃশ্য দেখে কৃষকের চোখ জুড়িয়ে যায়, কলিজা শীতল হয়। কিন্তু সহসাই ঝাঁকে ঝাঁকে পোকা এসে মাথা তুলে উঁচু হয়ে ওঠা ফসলের চারাগুলো জাপটে ধরে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সবগুলো খেয়ে ফেলে। মাঠের সবুজ-শ্যামল শোভা অন্তর্হিত হয়ে পান্ডুবর্ণ ধারণ করে, গাছগুলো নিঃশেষে মরে পঁচে যায়।

অনুরূপভাবে সহসা উদ্বেলিত হয়ে আসা বন্যা-প্লাবনের স্রোতে ক্ষেতের ফসল ভেসে যায়। বৃষ্টি কম বা বেশী হলেও এর পরিণতি অত্যন্ত খারাপ করে দেয়। এটা দেখে কৃষক নৈরাশ্য ও হতাশায় ভেঙে পড়ে। এ সময় তার মনে দুঃখ ও দুশ্চিন্তার মেঘপুঞ্জ জমে ওঠে। তা দূর করার কি উপায় থাকতে পারে? এ এমন দুঃখ যা মানব জীবনের তিক্ত বাস্তব ও তার আশাব্যঞ্জক প্ল্যান-প্রোগ্রামের মাঝে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের ফলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মৃত্যুর অবিচল মহাসত্য মানুষের সমস্ত রঙীন স্বপ্ন, শক্তি ও পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দেয়। ঘটনাবলীর মৌল উপাদানসমূহের এই বিশ্লিষ্টতা এবং মৃত্যুর এই অমোঘ আক্রমণ দেখে সে বিদ্রোহ করতে উদ্ধত হয়; এমনকি কখনো-সখনো হতাশায় তার আত্মহত্যা করার ইচ্ছা জাগে। এই সময় একটি বিশ্বাসই তাকে আশ্রয় ও সান্ত্বনা দেয়। তা হচ্ছে মহান স্রষ্টা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। এই বিশ্বাসই তার সম্মুখে জমাটবাঁধা পুঞ্জীভূত অন্ধকারের মাঝে উজ্জ্বল আলোক-বর্তিকা হয়ে পথ দেখায়-আশার প্রতীক হয়ে তাকে সম্মুখের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বস্তুত এই বিশ্বাসই মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সকল অবস্থায় সব রকমের প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম। তাই মানুষের জীবন ধারাকে নৈতিক ও ধর্মীয় বিধি-বন্ধনের ছাঁচে ঢেলে তৈরী করা অপরিহার্য। খোদার প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও তাঁর আনুগত্য করে চলার মানসিক প্রস্তুতিই তার এই প্রয়োজন পূরণ করে-জীবনকে সুন্দর, সুসংবদ্ধ ও সুশংখল করে তোলে। এই বিশ্বাসই তার জীবনে এনে দেয় কাংক্ষিত গতিময়তা, অপরিসীম শক্তি-সাহস। এভাবেই সংস্কৃতিতে খোদা-বিশ্বাস, অন্যকথায় ধর্মবোধ একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে বসেছে। কেননা যে জ্ঞান-বিদ্যা মানুষকে দূরদর্শীতা ও আলো দান করে, নিয়তির উপরিউক্ত জটিল আবর্তে তা ব্যর্থ হয়ে যায়। তখন এই বোধ ও বিশ্বাসই হয় তার একমাত্র অবলম্বন। তার কারণ হল, যে সব পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক-সম্বন্ধ সারা জীবন ধরে সুদৃঢ় হয়ে রয়েছে তা মানব মনে একটা আবেগ ও উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে আর এই আবেগ-উচ্ছ্বাসই তাকে এসব ব্যর্থতার বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। মানুষের এসব প্রয়োজনের দরুণই সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ধর্মের একটা উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব স্বীকৃত। ধর্মের ভিত্তিতে সংস্কৃতি যেমন পায় দৃঢ়তা ও পরিপক্কতা, তেমনি লাভ করে নতুন জীবন-প্রেরণা ও শক্তিমত্তা।